ফনেটিক ইউনিজয়
পাহাড়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল
সমির মল্লিক
মিঠুন চাকমার কফিনের পাশে তাঁর ছেলে আত্মিক চাকমা তিরোজ
----

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ফের অস্থির হয়ে উঠেছে। আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর অনৈক্য সহিংসতার জন্ম দেয়। ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমাকে হত্যার করার পর থেকে আবারও অস্থির হয়ে ওঠে পাহাড়। শান্তিচুক্তির দুই দশক পরও পাহাড়ে শান্তি না আসার জন্য সরকারের আন্তরিকতাকে দায়ী করেছেন পাহাড়ের নেতারা। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যকার অনৈক্যও পাহাড়ের শান্তি না আসার একটা বড় কারণ। আর এর ফলে ঝুঁকির মুখে পড়েছে পাহাড়ের পর্যটনসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পাহাড়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম।
খাগড়াছড়িতে জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফের মধ্যকার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংঘাত অনেকটা কমে আসছিল। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া নিজেদের মধ্যকার সহিংস ঘটনা শোনা যাচ্ছিল না। এরই মাঝে আসে আগের বিভক্তি। ইউপিডিএফের একাংশ ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে আত্মপ্রকাশ করার পর থেকে পাহাড় আবারও অস্থির হয়ে ওঠে। নতুন এ সংগঠনের আত্মপ্রকাশের দুই মাসের মধ্যে খুন হন মিঠুন চাকমাসহ ইউপিডিএফের তিনজন নেতা-কর্মী-সর্মথক।
গত ৩ জানুয়ারি খুন হন ইউপিডিএফের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, পিসিপির সাবেক সভাপতি ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সংগঠক মিঠুন চাকমা। জনপ্রিয় এই তরুণ নেতার খুন দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) থেকে বিভিন্ন সময় বহিষ্কৃত নেতারা  ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে নতুন সংগঠন গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার ১৯ বছর পর প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন দলটিতে এবারই প্রথমবারের মতো বিভক্তি আসে। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফ থেকে বহিষ্কৃতদের একাংশ সাংবাদ সম্মেলনে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গঠনের ঘোষণা দেয়। তারা তপন জ্যোতি চাকমাকে (বর্মা) আহ্বায়ক ও জলেয়া চাকমাকে সদস্যসচিব করে ১১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে। তপন জ্যোতি চাকমা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করে বলেন, পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দলটি (ইউপিডিএফ) গড়ে উঠলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ আদর্শচ্যুত হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ইউপিডিএফের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা সঞ্চয় চাকমা, দিপ্তী শঙ্করসহ অনেকে দল ত্যাগ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ‘দল (ইউপিডিএফ) ছেড়ে যাওয়ার পর অনেক নেতা-কর্মীকে মেরে ফেলা হয়েছে। গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক, বলপ্রয়োগের রাজনীতি, চাঁদাবাজি, গুম, খুন ও অপহরণের রাজনীতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রের জাতীয় দিবস বর্জনের রাজনীতি, এমনকি অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রতিরোধের চেষ্টার রাজনীতি করে যাচ্ছে ইউপিডিএফ।’
অন্যদিকে, দলটি গঠনের পর থেকে প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে অভিযোগ করে বলা হয়, ‘সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মদদে তথাকথিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে ইউপিডিএফ থেকে বিভিন্ন সময় বহিষ্কৃতরা একটি সংগঠন করেছে। তারা এক বছর ধরে জেএসএস (এমএন লারমা) শেল্টারে ছিল। ওখান থেকে বেরিয়ে এসে তারা এ কাজ করেছে। যা প্রকৃতপক্ষে জুম্ম জনগণের সামনে মুখোশ বাহিনী হিসেবে উন্মোচিত হয়েছে। ১৯৯৫ সালেও একই চক্রান্ত হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন ইউপিডিএফের অন্যতম তরুণ সংগঠক মাইকেল চাকমা। তিনি সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকেই পার্বত্য এলাকা নিয়ে সরকার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে। সেই নীলনকশায় নতুন করে ডালপালা ছড়াচ্ছে। নব্য মুখোশ বাহিনী সরকারের ‘বি টিম’ হিসেবে কাজ করছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে যেভাবে রাজাকার, আলবদর দেশ ও জনগণবিরোধী কাজ করত, তেমনি আজকের নব্য মুখোশ বাহিনী পাহাড়ের জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করছে। বিভিন্ন চক্রান্ত করে পাহাড়ের আজও জাতিগত নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।
ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, রাঙামাটির সাবেক ইউপি সদস্য অনাদি রঞ্জন চাকমাসহ দুজনকে হত্যা করার পর মাস না পেরোতেই মিঠুন চাকমাকে হত্যা করা হয়। মাইকেল চাকমা সাম্প্রতিক দেশকালকে আরও জানান, এর আগেও ১৯৯৫-৯৬ সালে মুখোশ বাহিনী দিয়ে জনগণকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। সেই সময় মুখোশ বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে খুন হন অমর বিকাশ চাকমা। তিনি দাবি করেন, ইউপিডিএফই পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কেন্দ্র, এ ছাড়া জেএসএস বা জেএসএস (এমএন লারমা) সরকারের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করছে। সংগঠনগুলো ভূমি বিরোধ কিংবা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন-পীড়ন নিয়ে কোনো কথাই বলে না। এমনকি চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বললেও এ নিয়ে সরকারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করতে পারছে না। তবে ইউপিডিএফের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য লিটন চাকমা রাষ্ট্রীয় মদদে ইউপিডিএফ গঠনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, ‘মিঠুন চাকমা হত্যার সঙ্গে আমাদের দল কোনোভাবেই জড়িত নয়। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হত্যা হতে পারে।’
পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সংঘাতে দুই দশকে ছয় শতাধিক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থক প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া স্থায়ী পঙ্গুত্বসহ আরও সহস্রাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
পার্বত্য অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠন সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) থেকে বেরিয়ে আসা নেতা-কর্মীরা ২০০৮ সালে প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা সুধা সিন্ধু খীসার নেতৃত্বে গঠন করেন জেএসএস (এমএন লারমা)। দলটি খাগড়াছড়িকেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রলয় ও প্রভাব গড়ে তোলে। শুরু হয় জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (এমএন লারমা) ত্রিমুখী সংঘর্ষ। রাঙামাটি ও বান্দরবানে এখনো জেএসএসের রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও খাগড়াছড়িতে এই ত্রিপক্ষীয় সংঘাতে জেএসএস অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। খাগড়াছড়ির নিকটবর্তী লংগদু ও বাঘাইছড়িতে সন্তু লারমা জেএসএস এবং জেএসএস (এমএন লারমা) মধ্যে সর্বাধিক সংঘাত হয়।
জনসংহতি সমিতি-জেএসএসের (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সুধা সিন্ধু খীসাও মিঠুন চাকমা হত্যার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, জুম্ম জাতির মধ্যকার বৃহত্তর ঐক্য গড়ে না উঠলে পাহাড়ের চলমান সংকট ও অস্থিরতার অবসান হবে না। শাসকগোষ্ঠী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোতে বিভক্তির মাধ্যমে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। সরকারের সদিচ্ছার অভাবের কারণে চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে পাহাড়ের সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। পার্বত্য অঞ্চলের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ঐক্য না গড়ে উঠলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ ও সংঘাতের অবসান হবে না।

Disconnect