ফনেটিক ইউনিজয়
অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে শুরু অমর একুশে বইমেলা
এম ডি হোসাইন

অমর একুশে বইমেলা শুরুর এক সপ্তাহ হয়ে গেল। অথচ এখনো অনেক স্টলে চলছে গোছগাছ, মেরামত ও স্টল তৈরির ঠুকঠুক শব্দ। শৌচাগার তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি। সোহরাওয়ার্দীর সারা পথে উড়ছে ধুলা, বিক্রয়কর্মীদের মুখ ঢাকা মাস্কে, কাঁচাপাকা রাস্তায় হাঁটতে গেলেই হোঁচট খেতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত লাইটিং না থাকায় সন্ধ্যায় বইমেলার অনেক এলাকাই ডুবে থাকে অন্ধকারে। সরেজমিনে এসব দৃশ্য দেখা গেছে।
প্রকাশকেরা জানান, স্টল বরাদ্দের সময় অনেক সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হলেও কোনোটিরই দেখা মিলছে না। তাঁদের ভাষ্য, বইমেলায় নেই কোনো বসার ব্যবস্থা, নেই খাবার পানির সুবিধা, কিছু স্টলে এখনো দেওয়া হয়নি বিদ্যুৎ-সংযোগ, অনেক স্টলের সামনে নেই কার্পেট, বয়োবৃদ্ধদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যাও অপর্যাপ্ত। অথচ বইমেলার নিয়ম অনুযায়ী সবকিছুরই সুবিধা দেওয়ার কথা।
বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের বইমেলায় উন্নত ও স্থায়ী স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুরো ফেব্রুয়ারি মাসে মেলায় লাখো মানুষের পদচারণে থাকলেও সেখানে এত দিন ভালো মানের পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ছিল না। এবার বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ১৫টি পাকা স্থায়ী টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া নামাজের জন্য এখানে একটি অস্থায়ী মসজিদও থাকছে বলে জানিয়েছে বইমেলা কর্তৃপক্ষ।
তবে উৎস পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী নুর-এ-আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘শৌচাগার বা খাওয়ার পানির মতো জরুরি সেবা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। অথচ তাদের পর্যাপ্ত ফান্ড রয়েছে। লোকবল রয়েছে। অনেকে মাঠের পাশেই প্রস্রাব করছে। স্টল বরাদ্দ বাবদ প্রকাশকেরা যে অর্থ দিয়েছেন, সে অনুযায়ী কিছুই তাঁরা পাচ্ছেন না। পর্যাপ্ত সময় থাকলেও স্টল নির্মাণ শেষ হয়নি। অথবা যেনতেনপ্রকারে কাজ শেষ করা হচ্ছে। তবে এবার বইমেলার শুরু থেকেই বই বিক্রি সন্তোষজনক বলে জানান তিনি।
মেলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে পাকা স্যানিটেশনের কাজে নিয়োজিত নির্মাণশ্রমিকেরা জানান, এবার অস্থায়ী টিনে ঘেরা ছোট্ট খুপরি টয়লেটের বদলে পাকা টাইলস করা ১৫টি টয়লেট নির্মিত হচ্ছে। পুরুষদের জন্য ১২টি এবং নারীদের জন্য ৩টি। পুরুষ টয়লেটের পাশেই থাকবে ১২টি পানির কল। এটি নামাজের অজুর কাজে ব্যবহৃত হবে। টয়লেটের পাশেই থাকছে মাঝারি আকারের একটি মসজিদ। তবে নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি।
গতবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক প্রান্তে ঢাকা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দুটি পানির জারের ব্যবস্থা ছিল। যেখানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে পানি খেতে হয়। এবারও সুপেয় পানির কোনো বিশেষ ব্যবস্থা না থাকায় গতবারের মতোই মেলায় আগতদের ভোগান্তি হচ্ছে। এ ছাড়া ধুলা নিবারণের জন্য পানি ছেটানোর ব্যবস্থা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
মেলার নীতিমালা অনুযায়ী উদ্বোধনীর আগেই স্টল নির্মাণ করার কথা থাকলেও সপ্তম দিনেও বেশ কয়েকটি প্রকাশনীর স্টল ছিল অসম্পূর্ণ। বিক্রয়কর্মীদের আইডি কার্ড পরার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশির ভাগ কর্মীর কাছেই তা পাওয়া যায়নি। এসব নিয়ে গ্রন্থমেলা পরিচালনা কমিটিরও কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
দর্শকদের সুবিধার জন্য মেলায় বড় ডিজিটাল স্ক্রিনে তথ্য প্রচারের কথা বলা হলেও তার দেখা মেলেনি। অন্যদিকে ‘এনালগ’ তথ্যকেন্দ্রে দায়িত্বরতরাও ‘ঠিকঠাক’ তথ্য দিতে পারছেন না বলে জানান নন্দিতা তাবাসসুম নামের একজন পাঠক। পর্যটনের স্টলে খাবারের দাম ও মান নিয়েও রয়েছে ক্ষোভ। প্রকাশক সমিতির নেতা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বইমেলা আয়োজনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই যাদের, তারা কীভাবে নান্দনিক করবে মেলা। তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন করা বেশ কয়েকটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম রয়েছে আমাদের। তাদের হাতে দিলে মেলাটি আরও সুন্দর হতো।’
একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজন কমিটির সদস্যসচিব জালাল আহমেদ বলেন, ‘প্রতিবারই মেলায় আগতরা টয়লেট নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েন। এ কারণেই আমরা স্থায়ীভাবে উন্নত মানের টয়লেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। এ ছাড়া নামাজের জন্য অস্থায়ীভাবে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। অজু করার ব্যবস্থাও থাকছে এখানে। সার্বক্ষণিক পানি ও টিস্যুর ব্যবস্থাও রাখা হবে। এক কথায় একটি উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলছি।’
সুপেয় পানি ও ধুলা নিয়ন্ত্রণের জন্য কি ব্যবস্থা থাকছে, এমন প্রশ্নের জবাবে জালাল আহমেদ বলেন, ‘এটি গতবারের মতোই থাকবে। পানি ছিটিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। প্যাভিলিয়নগুলোকে আরও দৃষ্টিনন্দন করা হবে। এবং ধুলা যাতে কম উড়ে, সে ব্যবস্থাই করা হচ্ছে।’
এবারের মেলায় ইউনিট, প্যাভিলিয়ন ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গতবার যেখানে ৩৬৩টি ইউনিট ছিল এবার তা করা হয়েছে ৭৫০টি। প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০৯টি থেকে বাড়িয়ে ৪৫০টি করা হয়েছে। এবং প্যাভিলিয়নের সংখ্যা ১৫টি থেকে বাড়িয়ে ২৫টিতে উন্নীত করা হয়েছে।
বিভিন্ন প্রকাশনার বইয়ের পাশাপাশি বাংলা একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা থেকেও এবারের মেলায় প্রকাশ করা হয়েছে প্রায় শতাধিক বই। বই বিক্রির হারও আগেরবারের চেয়ে ভালো বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার কর্মীরা।

Disconnect