ফনেটিক ইউনিজয়
আমরা কৃতজ্ঞ, আমরা অভিভূত
জাহিদুর রহমান

এমনিতে ছুটির দিন, তার ওপর মাঘের মিষ্টি শীতল দুপুর। দুপুর গড়াতেই পাঁচ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সাম্প্রতিক দেশকাল কার্যালয়ে আসতে শুরু করলেন অতিথিরা। বিকেল চারটার আগেই যেন বয়ে গেল আনন্দধারা। মনে হচ্ছিল, এত আনন্দ কখনো দেখেনি কেউ। আড্ডার কথা ছিল সন্ধ্যা পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত তা গড়াল রাত অবধি।
বিশিষ্ট ও প্রবীণ নাগরিক, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, কলামিস্ট, যুব ও ছাত্রনেতা, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, ক্রীড়াবিদ, চলচ্চিত্র ও নাট্য ব্যক্তিত্বের পদচারণে মুখর ছিল সাম্প্রতিক দেশকাল। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর পর্ণকুটিরে শত শত অতিথি এসেছেন পত্রিকাটির সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রতি সমর্থন জানাতে। আমরা অভিভূত। আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সম্পাদক ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ অতিথিদের সাদর অভ্যর্থনা জানান।
শুক্রবার বিকেল চারটায় সম্পাদকের শুভেচ্ছা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাম্প্রতিক দেশকাল-এর জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা। আলোচনায় অংশ নেন ভাষাসংগ্রামী, সংস্কৃতিজন ও সাংবাদিক কামাল লোহানী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, সমুদ্র বিশেষজ্ঞ নুর মোহাম্মদ, রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী, জাহেদী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন মুসা, পানি বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, আবাসন নিউজের সম্পাদক ইবনুল সাঈদ রানা, বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ, নারীনেত্রী তাহেরা বেগম জলি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য বহ্নি শিখা জামালী, জাতীয় গণফ্রন্টের নেতা রেজা শাহেদ আল হুদা রজত, নাট্যকর্মী ও লেখক ফ্লোরা সরকার, শ্রমিকনেতা আব্দুস সাত্তার, সাংবাদিক আনোয়ার পারভেজ হালিম, সাংবাদিক আমিন আল রশিদ, গবেষক ও অনুবাদক ওমর তারেক চৌধুরী প্রমুখ।
সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কবি চঞ্চল আশরাফ, শামীম সাঈদ, শামীমা শোভন, শিশু সাহিত্যিক আহমেদ মুশফিকা নাজনীন, গল্পকার কাজী মেহজাবিন প্রমুখ। সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাহবুব রনি, হামিম উল কবির, দেলোয়ার হোসেন, মনিরুজ্জামান উৎসব, অভিজিত বনিক, মোমেনা আক্তার পপি, জাহিদুর রহমান, কদরুদ্দিন শিশির, সাম্প্রতিক দেশকাল-এর টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি নওশাদ রানা সানভী, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি ফয়সাল শামীম, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ইমরান সোহেলসহ কয়েকজন জেলা প্রতিনিধি।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সোনালী প্রিন্টিং প্রেসের জিএম তোফাজ্জল হোসেন, সমুৎসুক প্রিন্টার্স লি-এর জিএম কাজী আজিজুর রহমান, ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতি লি-এর সভাপতি মো. মোস্তফা কামাল, সংবাদপত্র কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি লি-এর মো. হানিফ প্রমুখ।
আলোচনা সভা শেষে কাটা হয় কেক। এরপর চলে অতিথি আপ্যায়নের পালা। তারপর দর্শকদের গানে গানে মাতিয়ে তোলেন কণ্ঠশিল্পী নন্দিতা দাস। এমন আনন্দ আয়োজনে দীর্ঘদিন পর সাক্ষাৎ হওয়ায় অতিথিদের অনেকেই পরস্পর ভাববিনিময় করেন। মেতে ওঠেন আড্ডা-আলাপচারিতায়। অতীতের ধূসর-স্মৃতি যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দেয় সেই আড্ডায়। এসব মিলে পুরো পরিবেশ আরও আনন্দঘন ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আড্ডা-আলোচনায় দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজপরিক্রমা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া- উঠে আসে সবই।
আলোচনা সভায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর সম্পাদক ইলিয়াস উদ্দিন পলাশ বলেন, ‘আমরা নানা মত ও চিন্তাকে পত্রিকার পাতায় স্থান করে দিতে চাই। এ বিষয়ে আমাদের কোনো দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নেই। আমরা ব্যাপক জনগণের পক্ষে, জাতীয় স্বার্থ ও দেশপ্রেমের পক্ষে।’
সম্পাদক বলেন, ‘পত্রিকার মালিকপক্ষ মূলত সামাজিক দায় থেকেই পত্রিকাটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বৃহৎ গণমাধ্যমে সেভাবে জনগণের কথা উঠে আসে না। আমরা চেষ্টা করছি জনগণের পক্ষে লিখতে। সমৃদ্ধ ও অগ্রসর দেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা পালনই সাম্প্রতিক দেশকাল প্রকাশনার অন্যতম লক্ষ্য। আমরা সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও মানবাধিকার সংরক্ষণের সংগ্রামে সহযোগী হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দুর্নীতি ও অন্যায় প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা প্রমাণ করেছি, জনগণের পক্ষে লিখলে পাঠকের ভালোবাসা অর্জন করা যায়, যার প্রমাণ সাম্প্রতিক দেশকাল-এর প্রচারসংখ্যা। সাম্প্রতিক দেশকাল এখন ৫৫টি জেলা ও ৭৩টি উপজেলায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক মফস্বল শহরে দৈনিক পত্রিকার চেয়ে সাম্প্রতিক দেশকাল বেশি বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত হওয়ায় এর বিস্তৃতির সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের চিন্তার সঙ্গে অনেককেই একমত প্রকাশ করতে দেখেছি। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি নানা সংকটও আছে। কোনো গোষ্ঠীকে সমর্থন না করায় আমরা হারিয়েছি বিজ্ঞাপন। তারপরও অনেকটা বিজ্ঞাপন ছাড়াই পত্রিকার প্রকাশ জনগণের প্রতি দায় থেকে পত্রিকাটি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আশা করি, ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তার সঙ্গে অনেকে যুক্ত হবেন। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ ও গণমুখী চিন্তার মানুষেরা আমাদের খুঁজে নেবেন।’
ভাষাসংগ্রামী, সংস্কৃতিজন ও সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, ‘সপ্তাহ শেষে সাম্প্রতিক দেশকাল ঘটনার পেছনের খবর আর সংবাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরে, দেশের দৈনিক পত্রিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর পার্থক্য এটাই। পত্রিকাটিকে ভিন্নমতের দেখেছি। তবে আমি তাদের সাবধান করে দিতে চাই, সামনে ভয়ানক পরিস্থিতি আসছে। মানুষের কথা বলতে গেলে বিপন্ন হতে হবে। ৫৭ ধারা পরিবর্তন করে আরও ভয়ানক আইন ৩২ ধারা এসেছে। কেউই এই কালো আইনের প্রতিবাদ করছে না। এমন আইনের বিরুদ্ধে জোরেশোরে প্রতিবাদ করা উচিত। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর চরিত্র- তারা জনগণের কথা বলতে চাইছে। সামনে চলার পথে তারা যেন এভাবেই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। সত্যিকার সাংবাদিকতার জন্য সাহস নিয়ে এগোতে হবে। পত্রিকাটির প্রকাশকেরও অসাধারণ সাহস আছে। তিনি লোকসান দিয়েও পত্রিকাটি চালিয়ে নিচ্ছেন।’ কামাল লোহানী সাম্প্রতিক দেশকাল কার্যালয়ে প্রতি সপ্তাহে একটি সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডা অনুষ্ঠান করার সুপারিশ করেন।
রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী বলেন, ‘মানুষকে বেড়ে উঠতে হয় দেশের জন্য, মানুষের জন্য। পত্রিকাটি আমরা মানুষের জন্যই প্রকাশ করছি। সাম্প্রতিক দেশকাল-এ প্রকাশিত ভালো লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করব। যাতে ভালো লেখাগুলো হারিয়ে না যায়। দেশটাকে সামনে রেখে যদি এভাবে পত্রিকাটি সংবাদ পরিবেশন করে, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি এই পত্রিকা কখনোই সংকটে পড়বে না। আমরা পত্রিকাটি চালিয়ে নিয়ে যাবো।’
সমুদ্র বিশেষজ্ঞ নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘সব বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে সাম্প্রতিক দেশকাল সত্য প্রকাশ করে আসছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় হোক। যে আলো ফোটানোর প্রত্যাশা আগামী দিনের পথচলার মধ্য দিয়ে, তা সফল হোক। সংবাদপত্রের দায়িত্ব বড় কঠোর। এই বন্ধুর পথ সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রার্থনা করছি।’
বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতুল্লাহ বলেন, ‘সাম্প্রতিক দেশকাল নিজের জীবনের কথা বলে। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর পাতায় পাতায় আমরা নিজেকে খুঁজে পাচ্ছি। যেভাবে তারা সংবাদের বিশ্লেষণ তুলে ধরে, তাতে এখন পত্রিকা হাতে না পেলেই মন খারাপ হয়। বিশ্লেষণগুলো পড়ে বেশ ভালো লাগে।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী বলেন, ‘সাম্প্রতিক দেশকাল-এর লেখনি মনকে আকৃষ্ট করেছে। আমি আশা করি, এভাবেই তারা দেশকে প্রগতির পথে নিয়ে যাবে।’
নারীনেত্রী তাহেরা বেগম জলি বলেন, ‘আমি মাঝে মাঝেই চলমান বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে এখানে মন্তব্য কলাম লেখার চেষ্টা করি। এখানে লেখা সাধারণত এডিট ছাড়াই প্রকাশ হয়। কিংবা কোনো সংযোজন-বিয়োজন করতে হলে লেখকের সঙ্গে আলোচনা করেই তা করা হয়। লেখকের এমন স্বাধীনতা পৃথিবীর কোনো গণমাধ্যমে আছে কি না তা আমার জানা নেই।’
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘বর্তমানে দেশে যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে, আমার প্রত্যাশা সাম্প্রতিক দেশকাল এই সংকটে জনগণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবে।’
শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘সাম্প্রতিক দেশকাল আজ ও আগামীকালের কথা নিরন্তর বলে যাবে, সে প্রত্যাশাই করছি। আর বলবে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের কথা। বলবে সুশিক্ষা, সুশাসন, সুসমাজ ও সুসময়ের কথা।’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য বহ্নি শিখা জামালি বলেন, ‘সংবাদ গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সাম্প্রতিক দেশকাল পঞ্চম বর্ষে পদার্পণ করেছে। আশা করছি, ভবিষ্যতেও পত্রিকাটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাদের অবদান রেখে যাবে।’
আবাসন নিউজের সম্পাদক ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, ‘সাম্প্রতিক দেশকাল যেন মানুষকে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলা শেখাতে পারে। আর দেশের মানুষের না বলা কথাগুলো তারা যেভাবে তুলে আনছে, তা যেন অব্যাহত থাকে।’
সাংবাদিক আমিন আল রশিদ বলেন, ‘আমাদের দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে যে কথাগুলো উঠে আসে না, তা সাম্প্রতিক দেশকাল তুলে আনে। তারা জনগণের কথা বলে। পত্রিকাটির সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে তা আমরা ভাগাভাগি করে নেব।’

Disconnect