ফনেটিক ইউনিজয়
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮
মুখোমুখি আইন আর ইতিহাস
জয়নাল আবদিন

২৯ জানুয়ারি মন্ত্রিসভা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬-এর বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করার প্রয়াসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ নামে নতুন আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে। আইনের নতুন নাম দিয়ে, নতুন মোড়কে বিতর্কিত ৫৭ ধারাকেই বহাল তবিয়তে রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে আরও কিছু নতুন ভীতিকর বিধিবিধান অন্তর্ভুক্ত করে, জনগণের বাক্‌স্বাধীনতা ও গৌরবের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার হাত-পা বেঁধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ নামে নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এর আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আরেকটি খসড়া মন্ত্রিসভা ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট অনুমোদন করেছিল। পরে সেই খসড়াটির গতিবিধি সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায়নি। ওই আইন নিয়েও তখন বিতর্কের ঝড় উঠেছিল।
ইতিমধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপক সমালোচনা এবং পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্কে সরগরম আছে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশও করেছে। প্রস্তাবিত আইনে ৬৩টি ধারা রয়েছে। কোনো কোনো ধারা সাংবাদিকের দায়িত্ব পালনে ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রথমে ফিরে দেখা যাক ৫৭ ধারার বক্তব্যে কী আছে।
৫৭ ধারায় বলা হয়, ‘ইলেকট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ-সংক্রান্ত অপরাধ ও উহার দণ্ড-
১। কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়। তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।
২। কোন ব্যক্তি উপধারা (১) এর অধীন কোন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
৫৭ ধারার বক্তব্য আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বক্তব্য একেবারে মণিকাঞ্চন যোগ। ৫৭ ধারার বক্তব্যই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রথমবারের অপবাধ, দ্বিতীয়বার বা বারবার অপরাধে বিভক্ত করে পৃথক পৃথক ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে নতুন আইনে। প্রস্তাবিত আইনের ২৫, ২৮, ২৯ আর ৩১ ধারার বক্তব্য ৫৭ ধারারই বক্তব্য। তবে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ প্রথমবার অপরাধের জন্য কম রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার অপরাধের জন্য সাজা ও জরিমানার পরিমাণ আরও বেশি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কোন পরিমাণ ও মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি। এই অস্পষ্টতা প্রস্তাবিত আইনকে ৫৭ ধারার চেয়েও কঠোরভাবে প্রয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। যদিও ২৫ ধারার অপরাধকে জামিনযোগ্য করা হয়েছে। ৫৭ ধারা ছিল অজামিনযোগ্য। ২৫ ধারার মুল বক্তব্য হচ্ছে, ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণাত্মক বা ভীতিকর কোনো তথ্য সম্প্রচার বা প্রকাশ করতে পারবেন না। যা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি, সুনাম ক্ষুণ্ন করে। এরূপ করলে সেই ব্যক্তি অনধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দ্বিতীয়বার বা বারবার একই অপরাধ করলে সাজা ও অর্থ দণ্ড আরও বেশি হবে। ২৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে বা মূল্যবোধে আঘাতের অপরাধে ৭ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ধারায় দ্বিতীয়বারের অপরাধের জন্য সাজা বেশি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ধারাটিকে জামিন অযোগ্য রাখা হয়েছে। ২৯ ধারায় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার বক্তব্যকে প্রতিস্থাপন করে সর্বোচ্চ ৪ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ৩১ ধারায় বিভিন্ন শ্রেণিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার একই ধারায় অভিযুক্ত হলে সাজার পরিমাণ আরও বেশি হবে।
এখানে উল্লেখ্য, ৫৭ ধারার বক্তব্য আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কতিপয় ধারার বিষয়বস্তুর আদিনিবাস হচ্ছে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৫০৫ ও ৫০৫ ক ধারার বক্তব্যেরই প্রতিরূপ। ৫০৫ ধারায় বলা আছে, যদি কোন লোক কোন বিবৃতি, গুজব বা রিপোর্ট প্রণয়ন করে প্রকাশ করে বা বিতরণ করে ৫৭ ধারা বা প্রস্তাবিত আইনের অপরাধগুলো করে, অপরাধী সাত বছর পর্যন্ত মেয়াদের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই দণ্ডবিধি প্রণয়নকালে ইলেকট্রনিক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। ১৫৮ বছর পর সেই কথাগুলোকেই সাজা আর জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি করে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের কথা বলা হচ্ছে। দণ্ড বিধির ৫০৫ ও ৫০৫ ক ধারার বক্তব্য আর ডিজিটাল আইনের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক কোনো প্রার্থক্য নেই।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারার বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি যদি ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতাকে নিয়ে কোন প্রোপাগান্ডা করে, সেই ব্যক্তির ১৪ বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার জীবন- এ সবই ইতিহাসের লিখিত-অলিখিত অধ্যায়। ভবিষ্যৎ ইতিহাসচর্চা আর গবেষণার বিষয়বস্তু। আইন করে ইতিহাস চর্চার হাত-পা বেঁধে দিলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাসচর্চার অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং নিরুৎসাহিত করা হবে। প্রকাশিত বা এ পর্যন্ত লিখিত ইতিহাসই যে একমাত্র সত্য, এমন ভাবনার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধারাই একমত নন। ইতিহাস প্রবহমান নদীর মতো চলবে, নদীর গতিপথ কেউ রোধ করতে পারে না।
প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারার বিষয়বস্তু স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার প্রয়াস বলে মনে করা হচ্ছে। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বেআইনিভাবে প্রবেশের মাধ্যমে কোন সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাষিত বা বিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার অতিগোপীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল যন্ত্র, কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন। তাহলে সেই কাজ হবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে প্রথমবার সর্বোচ্চ ১৪ বৎসর কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা অর্থ দণ্ড এবং দ্বিতীয়বার বা বারবার অপরাধের সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড ভোগ করতে হবে। এই ধারাটি একদিকে স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং অন্যদিকে তথ্য অধিকার আইনে তথ্য পাওয়ার অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করবে। গোপনীয়তা আর অতি গোপনীয়তার অজুহাতে ন্যায্য ও আইনত অধিকার পাবে না জনগণ। এই আইন প্রণয়নের পূর্বে ৩২ ধারায় উল্লিখিত সংস্থাগুলোর গোপনীয় ও অতি গোপনীয় বিষয়গুলোর ফিরিস্তি জনগণকে অবহিত করা জরুরি। প্রস্তাবিত আইনের বিস্তীর্ণ অপব্যবহারের পরিসরের কথা মাথায় রেখে আইনটিকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সঙ্গে আরও আলোচনা ও মত বিনিময় করা দরকার।

Disconnect