ফনেটিক ইউনিজয়
সঞ্চালন লাইন ভারতের, নির্মাণ হবে বাংলাদেশের টাকায়
মারুফ আহমেদ

বাংলাদেশের জমি ও অর্থ ব্যবহার করে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে চাইছে ভারত। প্রতিবেশী দেশটির বিহার ও আসাম রাজ্যকে সংযুক্ত করবে ৭৬৫ কিলোভোল্টের ওই উচ্চক্ষমতার লাইন। বিনিময়ে ওই লাইন থেকে বাংলাদেশ এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে পারবে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) সূত্র জানায়, বিহারের কাটিহার থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর হয়ে আসামের বরনগর পর্যন্ত ৭৬৫ কিলোভোল্ট ক্ষমতার সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ অংশ লাইনের দৈর্ঘ্য হবে ২০০ কিলোমিটার। এ জন্য ব্যয় হবে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা (৪০ কোটি মার্কিন ডলার)। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশকে দেওয়া ভারতের প্রতিশ্রুত তৃতীয় পর্যায়ের ঋণ (লাইন অব ক্রেডিট- এলওসি) সহায়তার মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এলওসির আওতায় এই ২০০ কিলোমিটার লাইন নির্মাণের জন্য পিজিসিবিকে ঋণ দেবে ভারত।
তবে ভারত তার বিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্মিতব্য লাইনের খরচ কেন বাংলাদেশকে ঋণ হিসেবে দেবে এবং সেই ঋণের সুদ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের বিদ্যুৎ ভারতে যাবে। মাঝে ব্যবহৃত হবে বাংলাদেশের জমি। সেই বিদ্যুতের লাইন নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ কেন সুদসহ ঋণ নিয়ে অর্থ খরচ করবে? ওই লাইনের বিদ্যুৎ যদি অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশকে পেতে হয় তবে লাইন নির্মাণের খরচও ভারতেরই বহন করা উচিত। আর বাংলাদেশ ভূখণ্ডের লাইনটুকু এ দেশেরই সংস্থা বা কোম্পানি নির্মাণ করতে পারে। ভারত এ ক্ষেত্রে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণে তদারক করতে পারে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক লাভক্ষতির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা উচিত।
এর আগে কুষ্টিয়া ও কুমিল্লা দিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ লাইন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দুই প্রান্ত দিয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে। এই সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রেও যার যার অংশে সেই দেশ লাইন নির্মাণ করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য নির্মিত লাইন নির্মাণের খরচ ভারত নিজেই বহন করেছিল এবং বিদ্যুতের দামের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হয়। কিন্তু এবারের লাইনটি দিয়ে ভারত তাদের এক রাজ্যের বিদ্যুৎ আরেক রাজ্যে নেবে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চাইলে তা থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎসচিব ড. আহমেদ কায়কাউস বলেন, ভারতে ৭৬৫ কিলোভল্টের একটি সঞ্চালন লাইন বাংলাদেশ হয়ে নির্মাণের একটি প্রস্তাব এসেছে। এ ধরনের প্রকল্পের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। নানা দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা যায়, ২০১৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের সীমানার ভেতর দিয়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল ভারত। দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েকটি বৈঠক শেষে এখন এই সংক্রান্ত প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ প্রতিবেশী নেপাল ও ভুটানে জলবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে ভারত। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, দেশটির সরকার বা কোনো কোম্পানির রপ্তানিতব্য বিদ্যুৎ প্রকল্পে মালিকানা না থাকলে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ নেওয়া যাবে না। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করা হয়। এ ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক ভারতের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে এবং আমদানিকারককে তা ভারত থেকে কিনতে হবে। এই নীতিমালা প্রণয়নের পর বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় নেপাল ভুটানের জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প থেকে সরে আসে। বাংলাদেশের তরফ থেকে এই শর্ত প্রত্যাহারের জন্য ভারতকে অনুরোধ করা হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। এখন এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে ত্রিদেশীয় বিনিয়োগের চিন্তা করা হচ্ছে।
পিজিসিবির এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণ রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সঞ্চালন লাইন গেলে পিজিসিবি সঞ্চালন মাসুল পাবে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত থেকে যে বিদ্যুৎ আমদানি করে, সেখানে সঞ্চালন মাসুল দুই দেশের সঞ্চালন কোম্পানি পায়। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয় দেখভাল করছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
তৃতীয় এলওসির জন্য গত অক্টোবরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই চুক্তির আওতায় ভারত বাংলাদেশকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে। এই ঋণে বিভিন্ন খাতের ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এর মধ্যে কাটিহার-পার্বতীপুর-বরনগর সঞ্চালন লাইন ছাড়াও বিদ্যুৎ খাতে আরও তিনটি প্রকল্প রয়েছে। এগুলো হলো, ১০৪ কোটি ডলার ব্যয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়ন, ১৫ কোটি ডলারে বাগেরহাটের মোল্লারহাটে ১০০ মেগাওয়াটের একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও রাজশাহীতে এক লাখ এলইডি বাল্ব সরবরাহ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর ডিপিপি তৈরি হয়েছে।
এর আগে ২০১০ সালে ১০০ কোটি ডলার এবং ২০১৬ সালের ২০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করে ভারত ও বাংলাদেশ। প্রথম এলওসির আওতায় ১৫টি প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়িত হয়েছে ১২টি। আর দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ১৪টি প্রকল্পের মধ্যে ১২টিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ভারত। ঋণ চুক্তি হলেও অর্থ ছাড়ে গতি কম। গত সাত বছরে তিন এলওসির এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ কোটি ডলার ছাড় হয়েছে, যা মোট ঋণের ৬ শতাংশ। আর ঋণের বিপরীতে সুদের হার অন্তত ১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের শতকরা ৭৫ ভাগ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, পরামর্শসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ও সেবা ভারত থেকে নিতে হবে। এতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন খরচ আরও বাড়বে।

Disconnect