ফনেটিক ইউনিজয়
রুটিন ফ্রেমে আবদ্ধ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি
ইমদাদ হক

কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরের শেষার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য ‘মুদ্রানীতি’ ঘোষণা করেছে। বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নতুন মুদ্রানীতিতে। একই সঙ্গে কমানো হবে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহও। এর প্রভাবে বাজারে ডলারের দাম আরও বেড়ে যাবে। কমে যাবে টাকার মান। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতির হার কমানো ও দেশ থেকে টাকা পাচার রোধেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ঘোষিত মুদ্রানীতি নিয়ে আশার আলো দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, রুটিন ওয়ার্কের অংশ হিসেবেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবশ্য, কয়েক বছর আগেও এমন নীতি ছিল না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। কয়েক বছর ধরে বছরে দুবার মুদ্রানীতি ঘোষণার রীতি চালু হয়েছে। এদিকে চলতি বছরের শেষ দিকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এই নির্বাচনের কারণে টাকার প্রবাহ বাড়বে। তাই নির্বাচনী চিন্তা মাথায় রেখেই বাজারে টাকার প্রবাহ কমানোর দিকে ঝুঁকেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাজারে টাকার প্রবাহ বা ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। আগেরবারের নীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এর প্রভাবে বাজারে এমনিতেই টাকার প্রবাহ কমে যাবে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে অন্যান্য খাতেও টাকার প্রবাহ কমানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে। প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ঋণ বেড়েছে ১৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। এ হিসাবে প্রকৃত অর্জনের চেয়ে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। এ কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। সরকারি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ শতাংশ। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ৯ শতাংশ। এ কারণে এ খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক সম্পদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। গত জুলাইয়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে অর্জিত হয়েছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে।
তবে নতুন মুদ্রানীতি নিয়ে সমালোচকদের মত মানতে নারাজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। তিনি বলেন, ‘সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নম্বর অগ্রাধিকার নতুন কর্মসংস্থান বাড়ানো। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক লেনদেন খাত স্থিতিশীল রাখার  চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এই সময়ে সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকির ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সজাগ রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ব্যাংক বেশি হারে ঋণ বিতরণ করেছে। যাদের এডিআর বেশি, তাদের সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে কমিয়ে আনতে হবে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের মুদ্রানীতির প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। আর সরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তাতে কপাল পুড়বে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের। আর বিনিয়োগ কম হলে স্বাভাবিকভাবেই গতিরুদ্ধ হবে দেশের শিল্প বিকাশের পথ। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়ানোর গতিও থমকে যাবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে সাড়ে ৫ শতাংশ। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ হার আরও বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদীর মতে, ‘প্রকৃত গতির চেয়ে বেসরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। তবে বিনিয়োগের জন্য প্রকৃত চাহিদা থাকলে ঋণ পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।’
তবে ঘোষিত মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন অনেকটাই চ্যালেঞ্জের বলে মনে করছেন সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তাঁর মতে, বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি রয়েছে। সেটি থেকে লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের। ঋণ বিতরণের মূল দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর। কিন্তু ব্যাংকগুলোতে সুশাসন না থাকলে ঋণের মান নিশ্চিত করা অনেক কঠিন। এ ছাড়া ডলারের বিনিময় মূল্য নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখা অনেক কঠিন হবে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের ঋণ বিতরণের হার বেশি আছে। এখন এটি কমিয়ে আনতে হবে। তবে মূল বিষয় হলো এডিআর। এটি কমানো হলে ঋণ বিতরণের ক্ষমতা কমে যাবে। আমাদের আমানতের উৎস বেশি নয়। সবাই আমানত বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নামলে সুদহার বেড়ে যাবে। এতে এক ব্যাংকের আমানত অন্য ব্যাংকে চলে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এম আর দেবনাথ বলেন, ‘ব্যাংকগুলো ঋণ ও আমানতের অনুপাত মানছে না। গ্রাহক আমানতের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। এমনকি সরকারি সংস্থার টাকাও অনেক ব্যাংকে আটকে পড়েছে। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ নেই। অথচ যন্ত্রপাতি প্রভৃতি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলা হচ্ছে। সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি প্রবর্তন হওয়া উচিত ছিল। ঋণের লাগাম টেনে ধরাই উচিত ছিল। তা না করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির হার বরং বাড়িয়ে দিয়েছে জানুয়ারি-জুনের জন্য। আবার মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ প্রদানসহ নানা ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো আওয়াজ নেই। মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে বারবার, তবে এসব ক্ষেত্রে সতর্ক না হলে খুব একটা যে কাজে আসবে না এই নীতি, তা বলাই যেতে পারে।’

Disconnect