ফনেটিক ইউনিজয়
মশা নিয়ন্ত্রণে অবহেলা-অনিয়মের অভিযোগ
ছড়াচ্ছে চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক
এম ডি হোসাইন

শীতের প্রকোপ কমার পর থেকেই মশার উপদ্রব বেড়েছে রাজধানীতে। আর এ অতিরিক্ত মশার কারণে আবারও চিকুনগুনিয়ার আশঙ্কায় রয়েছে ঢাকাবাসী। গত বছর ঢাকায় মশাবাহিত চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক সংক্রমণের পর এবার আগাম আতঙ্ক ছড়িয়েছে নগরবাসীর মনে। দুই সিটি করপোরেশন মশার উৎপাত কার্যকরভাবে দমন করতে না পারায় এ আতঙ্ক কমছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার ভেতর বেশকিছু অপরিষ্কার জলাশয় আছে। এসব জলাশয় থেকেই মশার প্রজনন হচ্ছে দ্রুত। সিটি করপোরেশনের ভাষ্য- রাজউক, গণপূর্ত অধিদফতর, সিভিল এভিয়েশন ও রেলওয়েসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু জলাশয় ব্যক্তিমালিকানাধীন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন জলাশয় আমরা পরিষ্কার করছি। অন্য প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির অধীনে থাকা জলাশয়গুলো পরিষ্কারের জন্য বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জে. ডা.  শেখ সালাউদ্দীন সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। বর্তমান সময়ের তাপমাত্রা ও আবহাওয়া মশার বংশ বিস্তারের উপযোগী। তাই মশার বংশ বিস্তার রোধে নগরবাসীকে সজাগ থাকতে হবে। বাসার ছাদে ফুলের টব, আশপাশের নোংরা আবর্জনার জায়গাগুলো নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার না রাখলে সিটি করপোরেশনের পক্ষে তা করে দেয়া সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দক্ষিণ সিটিতে মশার উৎপাত ব্যাপকতা লাভ করতে পারেনি। এখানে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এছাড়া ক্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। এর প্রথম রাউন্ড শেষের দিকে। এরপর দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু করা হবে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহুল ইসলাম বলেন, ‘ডিএনসিসির পুরো টিম নিয়ে সক্রিয়ভাবে মশক নিধনের কাজ শুরু করা হয়েছে। নগরবাসী সচেতন হলে অবশ্যই মশার বংশ বিস্তার রোধ করা সম্ভব।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মশক নিবারণী দফতরের মতো একটি সংস্থা। ওই সংস্থাগুলোর মতে, তাদের সহস্রাধিক কর্মী প্রতিদিন সকাল-বিকাল কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে এসব সংস্থার অন্তত আটজন করে কর্মী কাজ করার কথা। তাদের সকালে নালা-নর্দমায় মশার লার্ভা ধ্বংস করার জন্য ওষুধ ছিটানো এবং বিকালে স্প্রের মাধ্যেমে মশাপ্রবণ এলাকাসহ প্রায় সব এলাকায় ঘুরে ঘুরে মশা নিধন করার কথা। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কর্মীরা এসব নিয়ম মানছেন না।
কাজে ফাঁকি দিয়ে অন্যত্র ওষুধ বিক্রি করে দেয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে মশক নিয়ন্ত্রণে কর্মরতদের বিরুদ্ধে। এতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কার্যক্রম নিয়ে জনমনে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এবং সহস্রাধিক কর্মী বাহিনী মিলে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না নগরবাসী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মশা নিধনের জন্য প্রতি অর্থবছরের বাজেটে যে টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, তার অধিকাংশই সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পকেটে চলে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে লোক দেখানো মশন নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাতে কাজ হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে মশা নিধন করা সম্ভবও না। তবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এজন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে পুরোপুরি খরচ করলে মশার এত উপদ্রব হতো না।
গত বছর মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্ত হন ফার্মগেট মণিপুরীপাড়ার বাসিন্দা আফজাল। অনেকদিন শারীরিক সমস্যা থাকে বলে চিকুনগুনিয়া তার কাছে এক ভীতির নাম। আফজাল বলেন, ‘সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই মশার উৎপাত সাংঘাতিকভাবে বেড়ে যায়। পাঁচতলায় থাকি, তার পরও রক্ষা নেই।’ এ এলাকার ফুটপাতের চা দোকানদার মানিক বলেন, ‘কাস্টমার খারাইতেই পারে না। আমি পায়ে মোজা লাগায়া কাম করি।’ শুধু এই আফজাল বা মানিকই নন, মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীজুড়ে চিকুনগুনিয়া আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মশার কামড় থেকে রেহাই পেতে কেউ কেউ দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে ঘুমাচ্ছেন।
যদি চিকুনগুনিয়া গত বছরের মতো মারাত্মক আকার ধারণ করেই ফেলে, সেক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কী করা হচ্ছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্রের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মীরজাদি সেবরিনা ফ্লোরা সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘প্রধান কাজ জনসচেতনতা। এ মাস থেকেই এ কাজ ব্যাপকভাবে শুরু করা হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানানো হবে, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত কোনো সমস্যা দেখা দিলেই যেন আমাদের জানায়।’

Disconnect