ফনেটিক ইউনিজয়
লিসা কার্টিসের বার্তা
বাংলাদেশে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র
মাসুদুর রহমান
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের (বামে) পাশে লিসা কার্টিস
----

বাংলাদেশে একতরফা নির্বাচন পছন্দ নয় যুক্তরাষ্ট্রের। তারা এ দেশে বহু দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চায়। ‘বিশ্বাসযোগ্য’ নির্বাচন চায়। যেনতেন কোনো ভোট তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ বার্তা স্পষ্ট করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট লিসা কার্টিস।
বাংলাদেশ সফরকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক আহমদ সিদ্দিক, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও লিসা কার্টিসের বৈঠক হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাতের সময় দিতে পারেননি।
লিসা কার্টিসের বাংলাদেশ সফরে তিনটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। এক. বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন, দুই. রোহিঙ্গা সংকট এবং তিন. বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র এ দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করার পর অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা জয়ী হন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওই নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে। তবে ভারত, রাশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশ ওই নির্বাচনকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন বলে সমর্থন করেছিল। তারপর অনেক দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে গোটা পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা ছিল। সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। পশ্চিমাদের সঙ্গেও পারস্পরিক স্বার্থসংক্রান্ত সম্পৃক্ততা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এমন এক সময়েই লিসা কার্টিসের সফর বিশেষ গুরুত্ববহ।
লিসা কার্টিসের সফরে এটা স্পষ্ট হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র এবারও অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাইছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠককালে লিসা নির্বাচন নিয়ে জানতে চেয়েছেন। তিনি বহু দলের অংশগ্রহণে একটি অর্থপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেছেন। আবার বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাটাও জরুরি বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটাতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন বাংলাদেশে দেশটির রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। তিনি বলেছেন, ‘উন্নয়ন নাকি গণতন্ত্র’Ñ এ বিতর্কে দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গণতন্ত্র থাকলে অবাধ তথ্যপ্রবাহ থাকে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগে সুবিধা হয়।
তবে বৈশ্বিক মেরুকরণে আজকাল যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানই শেষ কথা নয়। বাংলাদেশে বিগত সাধারণ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করেই শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। মালদ্বীপ, নেপালসহ বাংলাদেশের আশপাশের অনেক দেশে চীনের প্রভাব বেড়েছে। ফলে বাংলাদেশে বিশ্বাসযোগ্য অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়ার কতটা প্রতিফলন ঘটে, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
লিসা কার্টিসের সফরকালেই লেখক ও শিক্ষক জাফর ইকবালের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয়। গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসতা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় বাংলাদেশকে পশ্চিমারা উদার মধ্যপন্থী দেশ হিসাবে চিহ্নিত করে আসছে। তবে পশ্চিমারা এটাও বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশ সন্ত্রাসের বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এমন আশঙ্কার কারণে বরাবরের মতোই লিসার সফরকালে যুক্তরাষ্ট্রের একটা আগ্রহের বিষয় ছিল নিরাপত্তা ইস্যু।
বাংলাদেশে বিগত একতরফা সাধারণ নির্বাচনের পর সারা দেশে সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছিল। ওই অস্থিরতার সুযোগে উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার সুযোগ নিতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এ কারণে রাজনৈতিক সহিংসতাসহ সব ধরনের সহিংসতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। তাই খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ার পরও দলটির আন্দোলনে সহিংসতার পরিবর্তে অহিংস নীতি লক্ষ করা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতোই এখনও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিরোধীদের জন্যে শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ বহাল রাখার মতো অবস্থানকে সমর্থন করে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ সফররত মার্কিন কর্মকর্তা লিসা কার্টিস জানান।
সফরকালে লিসা কার্টিস কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়। রোহিঙ্গারা নিরাপদে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরে যাওয়াকেই সংকটের সমাধান বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হওয়ার কারণে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। এ কারণে রোহিঙ্গা ইস্যু যাতে চাপা পড়ে না যায়, সেদিকেও লক্ষ রাখবে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কথা না বললেও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিকি হিলিসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সোচ্চার। মার্কিন কংগ্রেস এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বড় কোনো অ্যাকশনে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। লিসা কার্টিস ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয় দেশের সঙ্গে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র।  
লিসা কার্টিসের এ সফরের আগে ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেশাদার আমলারা বাংলাদেশ সফর করেছেন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর লিসা কার্টিস ছাড়া তার প্রশাসনের আর কেউ এ পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেননি। সেদিক বিবেচনায় তার এ সফর খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া বাংলাদেশে নির্বাচনী বছর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগও হয়েছে। লিসা ট্রাম্পের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাড়াও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা। এর আগে তিনি নাগরিক সমাজের সঙ্গে গবেষণার কাজে জড়িত ছিলেন।

Disconnect