ফনেটিক ইউনিজয়
কোটা নিয়ে বিপাকে সরকার
এম ডি হোসাইন

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি সংস্কার নিয়ে আন্দোলন হয়েছে বহুবার। কিন্তু সব সরকারই তা বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্কার না করে দিনে দিনে এর পরিমাণ বাড়িয়েছে। এবার বিদ্যমান কোটা সংস্কার চেয়ে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা গত ২৭  ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু কোটা সংস্কারের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের নাম জড়িত থাকায় আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেও কোটা সংস্কার না করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে ৮ এপ্রিল ঢাকাসহ সারা দেশে গণপদযাত্রা কর্মসূচি ও রাতভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পর কোটা সংস্কার নিয়ে বিপাকে পড়েছে সরকার। পুলিশ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে এখনও থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের।   
জানা যায়, শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের আন্দোলনের চাপে ৯ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকেও কোটা নিয়ে অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছে। এ সময় কোটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া ৭ মের মধ্যে সরকার বিদ্যমান কোটার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে বলে জানা গেছে।
এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোনো সুবিধা একবার দেয়া হলে সেটি বাদ দেয়া অনেক কঠিন। আর মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া আরও কঠিন। ফলে সরকারের উচ্চপর্যায়ে কোটা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আগামী ৭ মের মধ্যে সরকার বিদ্যমান কোটার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।’
জানা যায়, বিদ্যমান কোটার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, সরকারের এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলন আগামী ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত করেছেন আন্দোলনকারীরা। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মধ্যে একাংশ আন্দোলন স্থগিত রাখার পক্ষে নয়। ফলে আন্দোলন আবারও চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ। এ অংশটি আগের সেই অংশকে অবাঞ্ছিতও ঘোষণা করেছে। তাদের দাবি, ‘সরকারের সঙ্গে বৈঠকে আগের কমিটি শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলেনি। ফলে আমরা আগের কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম।’  
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে থাকা বিপাশা নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা আলোচনা ও আন্দোলন একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ফলে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ১৬ এপ্রিল ‘চল চল ঢাকা চল’ কর্মসূচি পালন করা হবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য আন্দোলন চলবে। সাতদিনের মধ্যে আমাদের পাঁচ দফা দাবি মানতে হবে। এছাড়া তিনদিনের মধ্যে দাবি মেনে নেয়া হচ্ছে, এমন কথা লিখিতভাবে জানাতে হবে, তাহলে আন্দোলন থেকে সরে আসব। আগের কমিটি সরকারের পক্ষে কথা বলায় আমরা নতুন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আন্দোলন চালিয়ে যাব। আশা করি, এখন থেকে নতুন কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী সব শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নেবেন।’
মঙ্গলবার আন্দোলনে অংশ নিয়ে নতুন কমিটির পক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ জুবায়ের উদ্দীন বলেন, ‘উপাচার্য স্যারের বাসায় যে হামলা হয়েছে, আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। ক্যাম্পাসে পুলিশ দিয়ে নির্যাতন, বহিরাগত ব্যক্তিদের দিয়ে আক্রমণ এগুলোর সুষ্ঠু বিচার চাই। ক্যাম্পাসে পুলিশের অবস্থান শিথিল করতে হবে। আমাদের কটাক্ষ করে মতিয়া চৌধুরী যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মঙ্গলবার বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করে লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।’
তবে নতুন করে আন্দোলনকারীদের আগের কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন এ পক্ষটিকে মিছিল না করার অনুরোধ জানান মঙ্গলবার। সরকার শেষ পর্যন্ত কী করে, তা দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়ার অনুরোধ জানান। তবে সে অনুরোধ উপেক্ষা করে মিছিল শুরু করে আন্দোলনকারীদের এ পক্ষটি।
এদিকে ৮ এপ্রিল থেকে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। তবে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানান, উপাচার্যের বাসায় হামলায় জড়িত হিসেবে যাদের শনাক্ত করা হবে, তাদের ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেয়া হবে। ৯ এপ্রিল রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ, সংঘর্ষের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে তিনি জানান।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ২০০ জন, যার মধ্যে দুজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবাসিক চিকিৎসক মো. আলাউদ্দিন। আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ পুলিশ সদস্য। তাদের বারডেম ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কোটা সংস্কারের এ আন্দোলনে ৮ এপ্রিল রাতে হলের গেট ভেঙে কুয়েত মেত্রী হল ও বেগম ফজিলাতুন নেছা হলের শত শত ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নেমে আসেন। এ আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাও পদত্যাগ করেছেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত সুন্দর আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের বলেছি, আগামী ৭ মের মধ্যে সরকার বিদ্যমান কোটার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। সে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত থাকবে। সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাদের অবস্থান আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করবে, প্রধানমন্ত্রীও তরুণদের যৌক্তিক দাবির বিরোধিতা করেন না। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের দাবির ব্যাপারে সমাধান খোঁজা হবে। কোটা সংস্কারের ব্যাপারে সরকার আগের মতো অনড় অবস্থানে নেই। আমরা তাদের দাবির  যৌক্তিকতা ইতিবাচকভাবে দেখি।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম বলেন, ‘কোটা নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছে। এ সময় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন ও এর যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। কোটায় পদ না পেলে ফাঁকা পদগুলো মেধা তালিকা থেকে পূরণের সিদ্ধান্তই একটা সংস্কার। এ কারণে মেধাবীরা খুব একটা বঞ্চিত হন না।’
মো. শফিউল আলম জানান, গত ৬ মার্চ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়, যদি কোনো কোটা পূরণ না হয়, তাহলে তা মেধা কোটা থেকে নিয়ে পূরণ করা হবে। সেই ব্যাখ্যা নিয়ে একটি ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই ব্যাখ্যা দিয়ে জারি করা ওই পরিপত্র খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা মেধা কোটা থেকেই পূরণ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, যেহেতু কোটা পূরণ হয় না, তাহলে পদ্ধতি সংস্কার করে মেধা কোটা বাড়াতে সমস্যা কোথায়? জবাবে সচিব বলেন, এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়।
তবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ (১) ধারায় বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের  ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। তবে ২৯ (৩) (ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভের উদ্দেশ্যে তাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করতে পারে। নাগরিকদের অনগ্রসর অংশকে অগ্রগতির মূল স্রোতধারায় আনয়নের জন্য ১৯৭২ সালে এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি চালু করা হয়। এ কোটা বাড়তে বাড়তে আজকের অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এখন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশসহ নারী, জেলা, নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত আছে। আর মেধা কোটা রয়েছে মাত্র ৪৪ শতাংশ।
এবিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, “সংবিধানের ২৯ (৩) (ক) অনুচ্ছেদ নাগরিকদের ‘অনগ্রসর অংশের’ জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে, ‘অনগ্রসর অঞ্চলের’ জন্য নয়। ফলে জেলা কোটার সাংবিধানিক ভিত্তি নেই বলা যায়। সংবিধান অনুসারে মুক্তিযোদ্ধা কোটারও কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, তাই মুক্তিযোদ্ধারা, বিশেষ করে তাদের সন্তানেরা ঢালাওভাবে অনগ্রসর অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন না। কোটা সুবিধার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে অনিয়ম। অনেক সচিবও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। নাতি-নাতনি ও সন্তানদের ক্ষেত্রে এ অনিয়মের পরিমাণ আরও বেড়েছে।”
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ ৮ এপ্রিল বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শাহবাগে জমায়েত করেন। সেখানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। এরপর আন্দোলন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন বিকালের দিকে সচিবালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ২০ জনের একটি প্রতিনিধি দল সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠকেও বসে। ওই প্রতিনিধি দল সরকারের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করার কথা জানালেও আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা মেনে নেননি। আন্দোলনের নতুন কমিটি গঠন হয়। ওই কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী, ১০ তারিখও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন এবং ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি চলেছে।

Disconnect