ফনেটিক ইউনিজয়
কোটা ব্যবস্থা
চাইলাম সাম্য পাইলাম বৈষম্য
নাহিদ হাসান

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ অভিধানে কোটা শব্দের ৫ রকমের অর্থ করেছেন। ১. ইষ্টক রচিত গৃহ; ২. প্রকোষ্ঠ, কুঠরি, ঘর; ৩. বিভাগ, থাক; ৪. দশক অনুসারে নামতার বিভাগ ও ৫. কোষ্ঠা, পাট। এ কোটা আজ বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের সর্বাধিক উচ্চারিত শব্দ। এ কোটা একদিন ছিল এই ভূখ-ের মানুষের আশীর্বাদ, আজ তা জন্মের পাপ।
১৯৩১ সালের আদমশুমারিতে দেখা গেছে, ১০ শতাংশ উচ্চবর্ণের শতভাগই সব সুবিধাভোগী। আর জনসংখ্যার বাকি অংশ জন্ম থেকেই বঞ্চিত। তারপর খেলাফত-অসহযোগ আন্দোলন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৯২৫ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বাঙালি মুসলমান ও তফসিলি সম্প্রদায়কে রাজনীতির ময়দানে এনে উপস্থিত করে। এই প্রথম তারা নিজেদের ঐতিহাসিক সামর্থ্য ও কর্তব্য সম্পর্কে বুঝতে পারে। এই বুঝ তাদের পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা বানায়, বানায় বাংলাদেশ নামের জাতিরাষ্ট্রের কারিগর। যোগেন ম-লরা যার প্রথম পুরুষ। এই রাষ্ট্রের সংবিধানে তাই ধর্ম-লিঙ্গ-জাতি-আঞ্চলিক ও কৃষক-শ্রমিকের বঞ্চনার কথা স্বীকার করা হয়েছে। সে কারণে বর্তমান কোটা ব্যবস্থায় নারী ১০, জেলা ১০, আদিবাসী ৫ ও প্রতিবন্ধী ১- মোট ২৬ ভাগ কোটা নিয়ে কেউ কথা তোলেনি। এর বাইরে আছে পোষ্য কোটার ২০ ভাগ, যা কোথাও উল্লেখও নেই। যার পিতা-মাতা যে বিভাগে চাকরি করেছেন, সেখানটা যেন তার সন্তানদের তালুক।
কিন্তু স্বাধীনতার পর পরই উপরের কোটাগুলোর সাথে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নামে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতিদের সুবিধাদানের ব্যবস্থা করা হয়। আর এ সুবিধা পেতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি হচ্ছে দেদার, নয়া সরকার মানেই নয়া মুক্তিযোদ্ধা। ব্রিটিশরা যেভাবে অনুগত জমিদার গোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে, এখানেও অনেকটা তাই হয়েছে। এর প্রতিবাদে ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কাজী নূর-উজ-জামান বীর উত্তম খেতাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব সমগ্র দেশবাসীকে দিয়েছেন।
‘আমিই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাত থেকে এ দেশকে মুক্ত করেছি। আমি এ দেশের জনক। একমাত্র ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ আমায় রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরাতে পারবে না’- কথাগুলো বলেছিলেন রবার্ট মুগাবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটাও যেন সে রকমই একটি ব্যাপার। আমাদের পিতারা এ দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, অতএব...। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কাছে এ কোটা সুবিধা নেয়া যেমন অপমানজনক, পিতাদের কাছেও।
মোগল আমলে ভারতে আখলাক সাহিত্য লেখা হতো। ঐতিহাসিক মুজফ্ফর আলম বলছেন, আখলাক সাহিত্যে সুলতানের আবশ্যিক গুণের মধ্যে প্রধান ধরা হতো আকল বা সুবিবেচনা, ধর্মজ্ঞান বা ধর্মনিষ্ঠা নয়। সুলতানের আকল থাকলে আদিল বা সুবিচার পাওয়া যায়। আর সুবিচার থাকলে রাজ্য ও সম্মিলিত প্রজাবর্গের মঙ্গল সাধন সম্ভব হয়। কিন্তু আমাদের স্বাধীন দেশের নেতারা ধর্মনিষ্ঠা দেখিয়েছেন, কিন্তু আকল দেখাতে পারেননি। ফলে স্বাধীন দেশে কৃষকরা দিনের পর দিন জমি হারিয়েছেন, শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমেছে, বেড়েছে আঞ্চলিক বৈষম্য ও শ্রেণীভেদ। সংসদসহ কোথাও কৃষক-শ্রমিকের কোটা নেই, জমিতে স্বত্ব নেই, কারখানায় শেয়ার নেই। ইস্পাতের সুরক্ষিত কোটার ঘরে বাস করছেন নয়া বিত্তবানেরা। কয়েক দিন ধরে যে কোটা সংস্কারের জন্য রাস্তায় নেমেছেন, লাঞ্ছিত হচ্ছেন, তা আসলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের জন্যই। একসময় যোগেন ম-লরা মানবিক মর্যাদার জন্য কোটা চেয়েছেন, আর এরা এখন কোটা সংস্কার চাচ্ছেন ওই এক কারণেই।

শাহবাগ যেন লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী কোটার পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করার পর এপ্রিলের ৮ তারিখ শাহবাগসহ দেশব্যাপী তরুণেরা যেভাবে রাস্তায় নেমে আসেন, মহিলা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা যেভাবে ভূমিকা নেন আর পুলিশ ও ছাত্রলীগ যেভাবে আক্রমণ চালিয়েছে, তা বিস্ময়কর। কোটা ব্যবস্থার সুবিধাভোগী কয়েক লাখ মানুষ ছাড়া গোটা বাংলাদেশই যেন এ তরুণদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাও গতকাল পদত্যাগ করেছেন আন্দোলনের সমর্থনে।
ব্রাহ্ম সমাজের সদস্য ও শিবনাথ শাস্ত্রীর শিষ্য আনন্দচন্দ্র মিত্র নামের একজন শিক্ষক, ময়মনসিংহে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ১৮৭৬ সালে রাষ্ট্রনীতিবিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন ‘ব্যবহার দর্শন’; যার শিরোনামের নিচে ইংরেজিতে লেখা ‘অ্যান ইনট্রোডাকশন টু দ্য সায়েন্স অব পলিটিকস’। জনাব মিত্র সায়েন্স অব পলিটিকস বলতে ব্যবহার দর্শন বুঝতেন। সেখানে বলেছেন, ‘যে সমাজে রাজশক্তি ও প্রজাশক্তি সম্মিলিত হইয়া কার্য্য করে, তাহাকে রাজ্য বলে। সমুদয় প্রজাশক্তি সম্মিলিত হইয়াই রাজশক্তির সৃষ্টি করে এবং সেই রাজশক্তির বশীভূত হইতে আপনা হইতেই বাধ্য হয়। রাজশক্তিও আবার প্রজাশক্তির এমন আয়ত্ত থাকে, যে কোন ক্রমেই প্রজাশক্তিকে উপেক্ষা করিয়া কোন কার্য্য করিতে পারে না। যে সমাজে এই রূপে কার্য্য চলে তাহাই প্রকৃত রাজ্য।’ বাংলাদেশ কি তবে আজ? মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তো আমরা এমন রাষ্ট্রই সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম। আমাদের ঘোষিত নীতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। ‘নীতি’ শব্দটি ‘নী’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার মানে হচ্ছে, টেনে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ যে বিদ্যার সাহায্যে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাই নীতি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পূর্বপুরুষদের এ নীতিই টেনে নিয়ে গেছে। আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

Disconnect