ফনেটিক ইউনিজয়
সঞ্চয়পত্রের ঋণে ব্যাংকঋণ শোধ করছে সরকার
হামিদ সরকার

সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ গুণ ঋণ নিয়েছে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে। ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেয়ার পরিবর্তে সরকার সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বাজার থেকে টাকা তুলে সেটা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে। অর্থবছরের প্রথম আট মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি অর্থ ধার করেছে সরকার। আট মাসেই অতিক্রম হলো পুরো অর্থবছরের বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা। ব্যাংক আমানতের সুদহার মূল্যস্ফীতির নিচে নেমে যাওয়ায় সঞ্চয়পত্র কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। শুধু গত পাঁচ বছরেই সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এতে সুদাসলে সঞ্চয়পত্রে সরকারের দায়দেনা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সরকার তার ব্যাংকঋণের অর্থ পরিশোধ করছে এ সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে নেয়া টাকা দিয়ে বলে অর্থনীতিবিদদের অভিমত।
অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি আট মাসে মোট ৫৩ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। এ ৫৩ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদাসল বাবদ ২০ হাজার ৭১২ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৩৩ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অথচ এবারের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করেছিল। এ হিসাবে চার মাস বাকি থাকতেই সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি অর্থ ধার করেছে সরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ কমলেও বছর বছর বেড়ে চলেছে সঞ্চয়পত্রে দেনার পরিমাণ। ২০০৭-০৮ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৫ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। পাঁচ বছর পর ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারের দেনা দাঁড়ায় ৬৪ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। তবে পরের পাঁচ বছরে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে সুদাসলে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নেয়া ঋণে ১০-১২ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। যদিও ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ২ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে ৯১ দিন মেয়াদি ও ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ সুদে পাঁচ বছর মেয়াদি ব্যাংকঋণ নিতে পারত সরকার। সঞ্চয়পত্র থেকে চাহিদার অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ায় ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ তো নিচ্ছেই না, উল্টো ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আগের বকেয়া থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বিভিন্ন ব্যাংককে। এতে ব্যাংক ব্যবস্থায় সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে গত অর্থবছর ৯০ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদাসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর জন্য ব্যাংকাররা দীর্ঘদিন থেকেই দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা মনে করেন, ব্যাংকগুলোর চেয়ে সঞ্চয়পত্রে সুদহার ক্ষেত্রবিশেষে বেশি হওয়ায় ব্যাংকে টাকা না রেখে সঞ্চয়পত্র কিনছে মানুষ। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশও এ খাতের সুদহার কমানোর পক্ষে। তাদের যুক্তি, এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্থ আহরণ হওয়ায় বাড়তি সুদ গুনতে হচ্ছে সরকারকে। কেননা সঞ্চয়পত্র বিক্রি করার মাধ্যমে সরকার জনসাধারণের কাছ থেকে ঋণ নেয়। ফলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঋণের বিপরীতে সরকারকে সুদসহ বাড়তি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে বাজার থেকে যে টাকা তোলা হয়েছে, সেটা যদি পুরোপুরি সরকারি খরচে চলে যেত, তাহলে ব্যাংকিং খাতে আমানতের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হতো না। সেটা শুধু হাতবদল হতো, ব্যক্তিখাত থেকে সরকারি খাতে চলে যেত। কিন্তু সেটা ব্যাংকঋণের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ব্যয় করা হয়েছে।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রাশেদ আল তিতুমীর জানান, ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতির সঙ্গে সরকারের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৬ হাজার ৭৭২ কোটি টাকায় দাঁড়ায়, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৯৩ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ছিল। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ উৎস বিশেষ করে ব্যাপক হারে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির (চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ৩৯ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বেশি) মাধ্যমে সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগযোগ্য অর্থের চাহিদার হ্রাস নির্দেশ করে। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের বর্তমান স্থবিরতা দীর্ঘ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

Disconnect