ফনেটিক ইউনিজয়
উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও প্রশ্নফাঁসের প্রভাব মাধ্যমিকের ফলাফলে
এম ডি হোসাইন

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এবারও পাসের হার কমেছে। শুধু তা-ই নয়, নয় বছরের মধ্যে এসএসসিতে এবার পাসের হার সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় পাসের হার কমেছে আড়াই শতাংশেরও বেশি। তবে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৮৬৮। পাসের হার এভাবে কমে যাওয়ার জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়নে কড়াকড়ি ও প্রশ্নফাঁসের নেতিবাচক প্রভাবকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় ১৭টি বিষয়ের মধ্যে ১২টির এমসিকিউ বা বহুনির্বাচনী প্রশ্নের আংশিক ফাঁস হওয়ার প্রমাণ পেয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় কয়েকটি পরীক্ষা বাতিল করার দাবিও উঠেছিল। কিন্তু কোনো পরীক্ষা বাতিল না করেই ৬ মে প্রকাশ করা হয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি পরীক্ষার ফলে। উল্টো ফাঁস হওয়া প্রশ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ফল খারাপ করেছে বলে মনে করছেন তারা। তবে কারও কারও মতে, এবার ফল খারাপ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও তার বক্তব্যে একই মত দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে ২০১৬ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে পাসের হার। তবে এটা নেতিবাচক কিছু নয়। কারণ এর আগে অনেক পরীক্ষক খাতা না দেখেও নম্বর দিয়েছেন। এসবের প্রমাণও পেয়েছি আমরা। এছাড়া এবার ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থীরা খারাপ করায় এর প্রভাবও পড়েছে সার্বিক ফলাফলে।’
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে পাসের হার একলাফে বেড়ে যায় ১১ শতাংশ। ওই বছর পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালে পাসের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাসের হার বেড়েছে। ২০১৪ সালে আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট পাস করেছিল ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী। সেটা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পাসের রেকর্ড। ২০১৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেশি পাস করেছিল ওই বছর। ২০১৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর এবার পাসের হার ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ, যা গত নয় বছরের তুলনায় সবচেয়ে কম। পাসের হার কমেছে ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
এবার ১০টি শিক্ষা বোর্ডের নয়টিতেই পাসের হার গত বছরের তুলনায় কমেছে। তবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে গত বছরের চেয়ে এবার পাসের হার ২১ শতাংশ বেশি হওয়ায় পাসের হারের নিম্নগতি কিছুটা রোধ হয়েছে। এবার মাদ্রাসা ও কারিগরিসহ ১০টি শিক্ষা বোর্ডে ২০ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৪ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৪ জন।
ফলাফলে প্রশ্নফাঁসের কোনো প্রভাব পড়েছে কিনা, জানতে চাইলে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসের প্রভাব পড়েনি, তা বলা যাবে না। এতে প্রকৃত মেধাবীরা আশাহত হয়েছে। তারা দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিল।’
কথা হয় মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের পরীক্ষার্থী সাইফুল আলমের সঙ্গে। ফলাফল জিপিএ ৫ হলেও খুব বেশি উচ্ছ্বসিত নয়। সাইফুল জানায়, ‘প্রশ্নফাঁস হওয়ার ঘটনায় আমি ব্যথিত হয়েছি। হতাশায় দিন কেটেছে। প্রশ্নফাঁস বন্ধ হওয়া উচিত।’ একই প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থী মিথিলা মোস্তফাও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে। সে জানায়, ‘আমি খুশি। কিন্তু মেধাবী নয়, এমন অনেকে প্রশ্ন পেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এটা মেনে নিতে পারছি না।’
প্রতিবছরের মতো এ বছরও এসএসসি পরীক্ষায় একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এসএসসি পরীক্ষায় ১৭টি বিষয়ের মধ্যে ১২টিতেই নৈর্ব্যক্তিক (এমসিকিউ) অংশের ‘খ’ সেট প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।
পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে চার বছর ধরে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু) গবেষণা করছে। সেই গবেষণার ফল গত বছর থেকে প্রয়োগ করা হচ্ছে উত্তরপত্র মূল্যায়নে। গবেষণায় বেডু নম্বর প্রদানে বৈষম্য উদ্ঘাটন করে। সেই আলোকে মডেল উত্তরপত্র দিয়ে বৈষম্য কমানো হয়েছে। তার ভিত্তিতে অন্য পরীক্ষকরাও নম্বর দিয়েছেন। ফলে সারা দেশে নম্বর প্রদান ও খাতা মূল্যায়নে একটি সমতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এছাড়া এমসিকিউতে তুলনামূলক কম পাসের ধারা এবারও অব্যাহত ছিল।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা এখনও গণিত ও ইংরেজিতে অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা গণিতে ভালো হলেও ইংরেজিতে খারাপ করেছে। বিজনেস স্টাডিজ ও মানবিকের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি-গণিত দুটোতেই খারাপ করেছে। এ বছরও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উদারনীতির পরিবর্তে কঠোর ও পরিকল্পিত পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। এসব উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে ফলের ওপর।’
এদিকে মাদ্রাসায় এবার পাসের হার কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। ওই বোর্ডের শিক্ষার্থীরাও গণিতে বেশি খারাপ করেছে। পাশাপাশি কম্পিউটার স্টাডি বিষয়েও খারাপ করেছে। এ বিষয়ে মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম ছায়েফ উল্যাহ বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা গণিতে ও কম্পিউটার স্টাডি বিষয়ে খারাপ করেছে। গণিতে গত বছর পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ, এবার তা ৮০ দশমিক ২৯ শতাংশ। আর কম্পিউটার স্টাডিতে গত বছর ছিল ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ, এবার ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। কেন এ দুই বিষয়ে খারাপ ফল হলো তা খুঁজে বের করে আমরা ব্যবস্থা নেব বলে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আগে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে নম্বর দেয়া হতো। এখন সেটা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আমাদের সঠিক ফলের দিকেই যেতে হবে।’

Disconnect