ফনেটিক ইউনিজয়
ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন
মুসলিম বিশ্বের শান্তি আসবে কি?
জাকারিয়া পলাশ

শেষ হলো ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ৪৫তম সম্মেলন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে সম্মেলন শেষে প্রকাশিত ‘ঢাকা ঘোষণা’র তথ্য অনুযায়ী, এ সম্মেলনের থিমও নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। ফলে এবারের সম্মেলনের অর্জনগুলোও বাংলাদেশের নিজস্ব অর্জন বলেই মনে করা যেতে পারে।
সূত্রমতে, ৪৫টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এতে অংশ নেন। এছাড়া তিনটি পর্যবেক্ষক দেশ ও দুটি অতিথি দেশের প্রতিনিধি ছিলেন এ সম্মেলনে। সম্মেলনের থিম ছিল, ‘ইসলামিক মূল্যবোধ, টেকসই শান্তি ও উন্নয়ন’। বস্তুত ইসলামী মূল্যবোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও শান্তির যে সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি, তাকে সফলভাবে সমন্বিত করা হয়েছে এ থিমের সঙ্গে। এটি কৌশলগতভাবে সম্মেলনটিকে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বজনীন করতে সহায়ক হয়েছে। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকায় একটি বড় সাফল্য।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন এটি। বহুধাবিভক্ত মুসলিম বিশ্বের জন্য এ সম্মেলন কতটুকু সফলতা বয়ে আনবে, তা সম্মেলনের পর পরই অনুমান করা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব। তবে সম্মেলনের শেষে প্রকাশিত ডকুমেন্টগুলোয় কিছু প্রত্যাশা আর প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়েছে, যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে। এ সম্ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন নির্ভর করছে এ প্রতিশ্রুতির প্রতি দেশগুলোর কার্যক্রমের ওপর।
সম্মেলন শেষে প্রকাশিত ঢাকা ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘সবার জন্য সুবিধাজনক ক্ষেত্রে রাজনীতি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাসংক্রান্ত, পরিবেশগত, মানবিক বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য ওআইসিকে একটি কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় দেশগুলো।’ সেজন্য চার্টার অব ওআইসি ও ওআইসি-২০২৫ (প্রোগ্রাম অব অ্যাকশন) বাস্তবায়নের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয় এতে। সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বাড়াতে ওআইসি কাজ করবে।
এছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত মুসলিমবিশ্বে যে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ও শান্তির সংকট চলছে, তা নিরসনের জন্য অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি ও পবিত্র ধর্মকে বিতর্কিত করার উদ্যোগের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
ঢাকা ঘোষণায় মোট ৩৯টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের সহিংসতা, মানবিক সংকটের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নারী ক্ষমতায়ন, পারস্পরিক যোগাযোগ, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ, ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মতো উন্নয়নমুখী বিষয় উঠে এসেছে। পাশাপাশি বরাবরের মতোই মুসলিমবিশ্বের সর্বাধিক আলোচিত ও দীর্ঘমেয়াদি ফিলিস্তিন সংকট, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে স্বীকৃত অন্যতম মানবিক সংকট ‘রোহিঙ্গা ইস্যু’ নিয়েও দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ওআইসির সদস্য নয়, এমন দেশগুলোর মধ্যে যেসব অধিকারবঞ্চিত মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, আন্তর্জাতিক আইন ও সমঝোতার আলোকে তাদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। আফগানিস্তানের শান্তি ও স্থিতির জন্য সেখানকার সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সমঝোতার কাজ এগিয়ে নিতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার রোধের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক শান্তিকামী অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলা হয়েছে, ‘জনবিধ্বংসী অস্ত্র বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিকে আরও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।’
বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে ‘ঢাকা ঘোষণাকে’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বরাজনীতিতে শান্তিবাদী কূটনৈতিক চর্চার দেশ হিসেবে যে পরিচয় বাংলাদেশের রয়েছে, সম্মেলন-পরবর্তী ঘোষণার মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই ফুটে উঠেছে। এক্ষেত্রে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ঢাকা ঘোষণায় রোহিঙ্গা সমস্যাসহ বেশকিছু বিষয় স্থান পেয়েছে, যা বাংলাদেশের সরাসরি ‘জাতীয় স্বার্থের’ পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। এখন এর বাস্তবায়নে রাষ্ট্রগুলোর কার্যকর ভূমিকাই আসল প্রত্যাশা।  
সর্বোপরি মুসলিমবিশ্বে শান্তির ক্ষেত্রে ‘ঢাকা ঘোষণা’য় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে যে আলোচনা হয়েছে, তার কিছুটা আলোকপাত করা দরকার। সেখানে বলা হয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের আগের মানচিত্র অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের নাগরিকদের স্বাধীকারের পক্ষে আমরা নীতিগতভাবে আমাদের অবস্থান ব্যক্ত করছি। মুসলিম উম্মাহর জন্য জেরুজালেম (আল-কুদস-আল-শরিফ) ও ফিলিস্তিনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছি এবং এ বাস্তবতায় সম্প্রতি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়াকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের রেজুলেশন অনুযায়ী অবৈধ।’ ২০১৭ সালে ওআইসির ইস্তানবুল সামিটের ঘোষণার অনুসরণে পুনর্ব্যক্ত করা হয়, এ অবৈধ অগ্রগতির পরবর্তী যেকোনো ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন দায়ী থাকবে।
বিশ্বশান্তির পক্ষে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর দ্বিতীয় সারির নেতার এ ঘোষণা একটা ডকুমেন্ট বা প্রমাণ হিসেবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমবিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজে কোনো অগ্রগতি হবে কিনা, তা নির্ভর করছে সৌদি আরব, তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, মিসরসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ভূমিকার ওপর।
অস্বীকার করার সুযোগ নেই, বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ‘বহুমাত্রিকতার’ নীতিতে পরিচালিত। ওআইসির সম্মেলনে কোনো দেশ একটি বিষয়ে নৈতিক সমর্থন দিলেও বাস্তবে হয়তো সে তার রাষ্ট্রীয় কোনো স্বার্থে ওই বিষয়ের বিপরীত ভূমিকা পালন করে। দেশগুলোর কূটনৈতিক ভূমিকায় এসব বৈচিত্র্য কমিয়ে আনা গেলে ওআইসির এ সম্মেলন বড় ধরনের অগ্রগতি সাধন করতে পারে বিশ্বশান্তির পথে। এর মাধ্যমে বিশ্বশান্তি রক্ষায় কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হয়ে উঠতে পারে ওআইসি। অন্যথায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ‘কিছু বিষয়ে স্বীকৃতি’ ভিন্ন আর কিছুই অর্জন করার সুযোগ হবে না।
অবশ্য এ সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্জন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় সামনে আনা দরকার। তা হলো, বাংলাদেশ এ সম্মেলনের ফলাফলগুলো আনতে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রী এ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইসলামের মূলনীতি, উন্নয়ন ও বিশ্বশান্তির পক্ষে পাঁচ দফার একটি ধারণাপত্র তুলে ধরেছেন। এছাড়া এ সম্মেলনে ওআইসির কাঠামোগত বড় কিছু সংস্কারের জন্য বাংলাদেশ ও তুরস্ক যৌথভাবে প্রস্তাব দিয়েছে, যা আলোচনায় আসবে ২০১৯ সাল নাগাদ। সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ওআইসি সম্মেলনে এ ভূমিকা বাংলাদেশের অবস্থানকে সুসংহত করতে ভূমিকা রাখতে পারে। এখন প্রত্যাশার বিষয় হলো, টেকসই উন্নয়ন, শান্তি ও ইসলামী মূল্যবোধের যে সমন্বিত ধারণা ওআইসি সম্মেলনে বাংলাদেশ দেখিয়েছে, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা এবং অন্যান্য ফোরামেও এ ধারণার সামঞ্জস্য রাখতে পারা।

Disconnect