ফনেটিক ইউনিজয়
পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে
হামিম কবির

কয়েক দিন ধরে চলছে বৃষ্টি, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরমের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি হলে অনুকূল পরিবেশ পেয়ে নানা ধরনের রোগ-জীবাণু সক্রিয় হয়ে যায়। পানির মধ্যে জীবাণুর প্রবেশ ঘটে সহজেই। পানিবাহিত রোগ, বিশেষ করে ডায়রিয়া অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। ডায়রিয়ার প্রকোপ শুধু যে রাজধানীতে এমন নয়, রাজধানীর বাইরেও মোটামুটি একই রকম পরিস্থিতি। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে কয়েক ধরনের হেপাটাইটিস, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েডের মতো মারাত্মক রোগ। এসব রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে বেশ কিছুদিন ধরে দৈনিক ৬০০-৭০০ ডায়রিয়াজনিত রোগী আসছে।
আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আজহারুল ইসলাম খান সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘প্রতি বছর এ সময়টায় বাংলাদেশে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ে। গরম বেড়ে যাওয়ায় ঘাম বেশি হয়। ফলে বর্ধিত পিপাসা মেটানোর জন্য মানুষ বেশি পানি পান করে। গরমে পানির ঘনত্ব বাড়ে বলে পানিতে এ সময় জীবাণুর পরিমাণও বেড়ে যায়। পেটে ১০ লাখের বেশি জীবাণু প্রবেশ করলে ডায়রিয়া হয়।’  
রাজধানীর পানিতে জীবাণু ঢুকে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বর্ষা মৌসুম ঢাকায় খোঁড়াখুঁড়িটা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে বাজেটের একটি সম্পর্ক আছে। জুলাইয়ে নতুন বাজেট পাস হওয়ার আগে পূর্ব বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করার একটি প্রবণতা মন্ত্রণালয়গুলোর রয়েছে। পূর্বের বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করতে না পারলে পরের বাজেটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নতুন বরাদ্দ কমতে পারে। সে কারণে তড়িঘড়ি করে বর্ষার সময়ই রাজধানীতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। এতে অনেক সময় পানির পাইপ ফুটো হয়ে যায় অথবা পাইপে ফাটল ধরে। এ সময় রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের পাইপ বসানো হচ্ছে। সরকারি কাজে তদারকিটা কঠোর না থাকায় পাইপের ত্রুটি না সারিয়েই মাটি ভরাট করা হয়। ফলে পানির পাইপের ভেতরে বৃষ্টির পানি অথবা পাশাপাশি বসানো স্যুয়ারেজের লাইন থেকে দূষিত পানি ঢুকে যায়। এ কারণে পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ফাহিমা আহমেদ সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘বিশুদ্ধ পানির অভাবেই ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েডের মতো অসুখগুলো হয়। দূষিত পানির মাধ্যমে শরীরে যে শুধু পানিবাহিত রোগজীবাণুর প্রবেশ ঘটে তা নয়, এগুলো নতুন নতুন জীবাণুর সংক্রমণও ঘটায়। আবার পুরনো জীবাণুও নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। নানা ধরনের চর্মরোগও হয়ে থাকে। রোগ-জীবাণু থেকে মুক্ত থাকতে হলে বিশুদ্ধ পানি পানের বিকল্প নেই। অনেক সময় দেখা যায়, পানির উৎসের কাছেই রয়েছে ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়, মনুষ্য মলের ট্যাংক। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও দেখা যায় টিউবওয়েলের পাশেই রয়েছে ল্যাট্রিনের ট্যাংক। এ ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় থেকে দূষিত পানি খাওয়ার পানিতে চলে আসে, ফলে বিশালসংখ্যক মানুষ ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসের মতো অসুখে ভুগছে।’
পায়খানার সঙ্গে টিউবওয়েল বাসনো হয়েছে এমন টিউবওয়েলের পানি পরীক্ষা করে আইসিডিডিআর,বি তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, মাটির নির্দিষ্ট একটি স্তরে গিয়ে মলের পানি টিউবওয়েলের পানিতে মিশে যাচ্ছে। এভাবে মনুষ্য মল অথবা গোবরের মধ্যে থাকা মারাত্মক ধরনের জীবাণু পানির সঙ্গে মিশে চলে যাচ্ছে মানবদেহে। এ পানি পানে অনেকেই নানা ধরনের রোগ-জীবাণুতে ভুগছে।
আইসিডিডিআর,বিতে আসা ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, শিশুদের বেশি ডায়রিয়া হওয়ার কারণ শিশুরা পানি পানে বড়দের মতো সতর্ক নয়। তাছাড়া তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তুলনামূলক কম। আবার নারীদেরও একই অবস্থা। তাদের বেশির ভাগই দরিদ্র পরিবারের। কাজ করার পর পানি ফুটিয়ে পান করার মতো সময় ও সুযোগ তাদের বেশির ভাগেরই থাকে না। ফলে পাইপের পানি পান করে ডায়রিয়া আক্রান্ত হচ্ছে তারা।
আইসিডিডিআর,বিতে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। শুধু গরমের সময় নয়, এসব এলাকা থেকে সারা বছরই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে দরিদ্র মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, স্যুয়ারেজের পানি মিশে যাওয়া ছাড়াও ঝিলের নিচ দিয়ে অথবা ড্রেনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাইপ ফেটে গিয়ে ময়লা প্রবেশ করতে পারে পানির পাইপে।
ঢাকা ওয়াসার পানি নগরবাসী পান করলেও তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকে। কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময় ফোটানো হলেও পানিতে দুর্গন্ধ থেকে যায়। ফলে পান করাও সম্ভব হয় না। যাদের কিনে খাওয়ার সামর্থ্য আছে, তারা পানি কিনে পান করেন। অবশিষ্টদের এ দুর্গন্ধযুক্ত পানিই ভরসা। জানা গেছে, ঢাকায় সরবরাহকৃত পানির ১৫ শতাংশ আসে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার থেকে। এ শোধনাগারে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা থেকে পানি এনে শোধন করা হয়।
চিকিৎসকেরা জানান, একটু কষ্ট করে পানি ফুটিয়ে পান করলে ডায়রিয়ার সমস্যাটি থাকে না। ফুটাতে না পারলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দিয়ে পানি পান করা উচিত। ফিটকিরিও ব্যবহার করা যেতে পারে পানি বিশুদ্ধকরণে।
বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আতিয়ার রহমান সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘পানিবাহিত রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হলে অবশ্যই বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ময়লা অথবা দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে গোসলও করা যাবে না। পচা-বাসি খাবার, রাস্তার পাশের তৈরি শরবত পান থেকে বিরত থাকতে হবে। চটপটি অথবা ফুসকা অথবা ঝালমুড়ির মতো রাস্তার খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। এসব খাবারে টাইফয়েড, ডায়রিয়ার জীবাণু থাকে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় এ জীবাণুগুলো পাওয়া গেছে।’
ড. আজহারুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, পানিদূষণের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। পানি সমস্যার সমাধান না হলে এর খুব বেশি উন্নয়ন হবে না। তিনি বলেন, ‘গরমের এ সময়ে প্রতি বছরই বেড়ে যায় ডায়রিয়া। তবে এ বছর আক্রান্তের পরিমাণ বেশি। এ সময় ডায়রিয়ার জন্য দায়ী জীবাণুগুলো দ্রুত বংশ বিস্তার করে।’

Disconnect