ফনেটিক ইউনিজয়
গাজীপুরে আইনি লড়াই খুলনায় ভোটে শঙ্কা
আনছার আহমেদ

নৌকা-ধানের শীষের ভোটের লড়াই দেখার অপেক্ষায় ছিল গোটা দেশ। আদালতের রায়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত হয়ে যাওয়ায় ভোটের আমেজে কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে। ১৫ মে নির্ধারিত দিনে খুলনা সিটি করপোরেশনে ভোট হবে কিনা, তা নিয়েও সংশয়ে রয়েছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ, পরাজয়ের আশঙ্কায় সরকারি দল দলীয় নেতাকে দিয়ে রিট করিয়ে গাজীপুরের ভোট তিন মাসের জন্য স্থগিত করিয়েছে। একই পরিণতি হতে পারে খুলনায়। তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে আওয়ামী লীগ বলছে, ভোট স্থগিতে সরকারের হাত নেই।
২০১৩ সালের নির্বাচনে গাজীপুর ও খুলনায় জয়ী হয় বিএনপি। গাজীপুরে প্রার্থী বদল করে জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। গতবারের বিজয়ী আবদুল মান্নানের বদলে হাসান উদ্দীন সরকারকে প্রার্থী করেছে বিএনপি। খুলনায় গতবারের বিজয়ী মনিরুজ্জামান মনিকে বসিয়ে নজরুল ইসলামকে ‘ধানের শীষ’ দিয়েছে বিএনপি। আওয়ামী লীগ গতবারের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের ওপরই ভরসা রেখেছে।
দুই সিটিতে জমজমাট ভোটের লড়াই দেখার অপেক্ষায় ছিল পুরো দেশ। গত সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপির দাবি, দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির ‘আন্দোলনের’ অংশ হিসেবে দুই সিটিতে ভোটে অংশ নিচ্ছে তারা। তবে দলটি প্রচারের প্রথম দিন থেকেই অভিযোগ করছে, তাদের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে প্রচারে বাধা সৃষ্টি করছে সরকার। ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘিœত করছে। দলটি লাগাতার অভিযোগ করেছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। জনরায় ভ-ুল করার অপচেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। তবে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি নিশ্চিত পরাজয় জেনে ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে।
সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম আজহারুল ইসলাম সুরুজের রিটে গাজীপুরের নির্বাচনে তিন মাসের জন্য স্থগিত করতে গত রোববার আদেশ দেন হাইকোর্ট। এ রায় স্থগিতে চেম্বার জজের বেঞ্চে গিয়েও কোনো আদেশ পাননি বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দীন। রোববার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমও আপিলে শরিক হয়েছেন। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের আদেশের ওপর নির্বাচনের ভাগ্য নির্ভর করছে। সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচনের পক্ষে আদেশ দিলে ভোট হবে। কিন্তু এর মধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, রিটকারী আওয়ামী লীগ নেতা তথ্য গোপন করে নির্বাচন স্থগিতের রায় নিয়েছেন। তার অভিযোগ, শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা গাজীপুর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৩ সালে হাইকোর্ট একই বিষয়ের রিট রুল জারি করে খারিজ করে দিয়েছিলেন। রুল নিষ্পত্তি করে সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল।
এর আগে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র উপনির্বাচন ও দক্ষিণ সিটির ১৮ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায় আদালতের রায়ে। নির্বাচন কমিশন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর অভিযোগ, সরকারি দলের পরাজয় নিশ্চিত ছিল। এ কারণেই একের পর এক নির্বাচন স্থগিত হচ্ছে।
তবে গাজীপুরের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আপিল বিভাগের শরণাপন্ন হওয়ায় এ অভিযোগের জবাব সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেছেন, দলের নির্দেশেই আদালতে গিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বিষয়ে আন্তরিক। তিনি এখনও আশাবাদী, ১৫ মে নির্বাচন হবে। তাতে নৌকা বিজয়ী হবে।
সংবিধানের ১২৫ (গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে কোনো আদেশের আগে নির্বাচন কমিশনকে নোটিস ও যুক্তিসঙ্গত সময় দেয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতা আজহারুল ইসলাম সুরুজের রিট আবেদনে হাইকোর্টের আদেশের আগে বিষয়টি মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচন নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যেই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে গ্রেফতার। ভোট স্থগিতের রায়ের পর নাশকতার পরিকল্পনা ছিল, এমন অভিযোগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর আড়াই শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গ্রেফতার করেছে ১১ জনকে। হাসান সরকারের অভিযোগ, বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। জামায়াত প্রার্থী এসএম সানাউল্লাহ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে নির্বিঘ্নে প্রচার চালিয়েছেন। যখনই তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছেন, তার পরদিনই তাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হাসান সরকারের অভিযোগ, সরকারের নির্দেশে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন গ্রেফতার আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিএনপির মতো আওয়ামী লীগও গাজীপুরে বিভক্ত। মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমত উল্লাহ গত নির্বাচনে মেয়র পদে হেরেছিলেন। এবার তিনি মনোনয়নবঞ্চিত হন। মহানগরের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে আজমত উল্লাহর সমর্থকরা মাঠে নামেননি। যার রিটে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে, সেই আজহারুল ইসলাম সুরুজ সম্পর্কে আজমত উল্লাহর বেয়াই। এতে গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে রিটে আওয়ামী লীগের একাংশের হাত থাকতে পারে।
খুলনার বিএনপি প্রার্থীরও একই অভিযোগ। তিনি দাবি করেন, ভোটের উৎসবমুখর পরিবেশ নষ্ট করেছে ভয়ভীতি। সরকারি দলের সমর্থকরা বিএনপি কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। প্রচারে বাধা দিচ্ছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। যতই বাধা দেয়া হোক, বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে না। নজরুল ইসলাম মঞ্জুর শঙ্কা, খুলনার নির্বাচনও ভ-ুল করে দিতে পারে সরকার।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিএনপির এসব অভিযোগকে ঠুনকো অভিযোগ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তালুকদার আবদুল খালেকের দাবি, পরাজয় আঁচ করতে পেরে বিএনপি এসব অভিযোগ করছে। খুলনা সিটির ৩১টি ওয়ার্ডে ভোটার ৪ লাখ ৯৩ হাজার। এ সিটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ১৪ দলের সমর্থন পেলেও জাতীয় পার্টি (জাপা) প্রার্থী দিয়েছে। দলটির প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের প্রচার নেই নির্বাচনে। তার পরও এরশাদের দল কিছু ভোট পেতে পারে এ সিটিতে, যা আওয়ামী লীগের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাগেরহাটের একটি আসনের এমপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একজন নেতা তালুকদার আবদুল খালেকের বিরোধিতা করছেন, এমন গুঞ্জন রয়েছে। গত নির্বাচনেও তিনি বিরোধিতা করেছিলেন। যে কারণে তিনি জিততে পারেননি, এ যুক্তিতে এবার নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী ছিলেন না তালুকদার আবদুল খালেক। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রার্থী হন।
বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম দলের সব নেতার সমর্থন পাচ্ছেন, তাও নিশ্চিত নয়। মনোনয়নবঞ্চিত মেয়র মনিরুজ্জামান মনির অনুসারীরা মঞ্জুর প্রচারে সর্বাত্মকভাবে অংশ নিচ্ছেন না, এমন তথ্য রয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় এ গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়ে বলেন, শুধু বিএনপি নয়, জোট শরিকরাও ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। সবাই মঞ্জুর পক্ষে কাজ করছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রচারে নির্বাচনী এলাকায় গেলেও আওয়ামী লীগ নেতারা কৌশলগত কারণেই যাচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ চায় না, জাতীয় রাজনীতির প্রভাব স্থানীয় নির্বাচনে পড়ূক। জাতীয় রাজনীতির ইস্যুকে ভোট থেকে দূরে রাখতেই এ সিদ্ধান্ত। কিন্তু নৌকা-ধানের শীষের মুখোমুখি লড়াইয়ে জাতীয় রাজনীতির প্রভাব যে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।   
সুশাসনের জন্য নাগরিক সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচন উৎসবমুখর হোক। ভোটে বাইরের প্রভাব থাকলে পরিবেশ নষ্ট হবে। ভোট স্থগিত হয়ে যাওয়া কাম্য নয়। সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে, স্থানীয় নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনের বাধা দূর করা উচিত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মোফাজ্জল করিম বলেন, ভোটের প্রচার থেকে ধরপাকড় কাম্য নয়। পুলিশ যদি পরোয়নাভুক্ত আসামিকেও গ্রেফতার করে, তার পরও প্রশ্ন উঠবে। নির্বাচনের আর ক’দিন বাকি। তার পরও গ্রেফতার করা সম্ভব।

Disconnect