ফনেটিক ইউনিজয়
বাজেটে থাকছে ‘কালো টাকা’ ও ব্যাংকঋণ নির্ভরতা
হামিদ সরকার

সরকার কালো টাকার গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। কালো টাকাকে আবারও ছাড় দেয়া হচ্ছে। আগামী বাজেটে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থকে সাদা করার সুযোগ আবারও দিচ্ছে সরকার। প্রতিবছরই কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে কালো টাকা অর্জনকারীদের সুযোগ দেয়া হয়। এবার নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষণা দিয়েই এ সুযোগ রাখছে সরকার। আর সেই ঘোষণাটা রাজস্ব বোর্ডের মুখ থেকেই পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা হলো। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৩ থেকে ৮৩ শতাংশই হচ্ছে কালো টাকা।
রাজস্ব বোর্ড বলছে, বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ ও দেশে বিনিয়োগ অক্ষুণœ রাখতে এবারের বাজেটেও কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থকে সাদা করার সুযোগ থাকবে। প্রতিবারের মতো জরিমানার বিধান রেখেই এ সুযোগ দেয়া হবে। অন্যদিকে সরকার ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন করতে চায়। ফলে আগামী বাজেটে ব্যাংকঋণের টার্গেটই ধরা হচ্ছে ৫৯ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা বর্তমান অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে ঋণ নেয়ার টার্গেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি।
অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, কালো টাকার কাছে সরকার নতি স¦ীকার করছে। এতে একটি অবৈধ কাজকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ফলে বৈধ আয়ের ট্যাক্সদাতারা অনুৎসাহিত হবেন। এবারও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার পক্ষে। আবার সরকার ব্যাংক থেকে যদি বিশাল পরিমাণ ঋণ নেয়, সেক্ষেত্রে দেশের বেসরকারি খাত ঋণ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে। ফলে অর্জিত হবে না জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৪৭ বছরে ১৩ হাজার ৩৭২ কোটি কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর প্রথম সুযোগ দেয়া হয় ১৯৭১ সালে। ১৯৭১-৭৫ সময়ে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা, ১৯৭৬-১৯৮০ সালে ৫০ কোটি ৭৬ লাখ, ১৯৮১-৯০ সময়ে ৪৫ কোটি ৮৯ লাখ, ১৯৯১-৯৬ সালে ১৫০ কোটি ৭৯ লাখ, ১৯৯৭-২০০০ সালে ৯৫০ কোটি ৪১ লাখ, ২০০১-০৬ সালে ৮২৭ কোটি ৭৪ লাখ, ২০০৭-০৯ সালে (সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার) ৯ হাজার ৬৮২ কোটি ৯৯ লাখ, ২০০৯-১৩ সময়ে ১ হাজার ৮০৫ কোটি ও ২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়েছে। দেখা যায়, ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক আইন জারি করেন লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সামরিক আইনের ৫ নম্বর ধারায় ১৫ শতাংশ কর দিয়ে আবারও একই সুযোগ দেন। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরের বাজেটে শাহ এএমএস কিবরিয়া নিজেই স্বীকার করে নেন যে, কালো টাকা সাদা করার এ সুযোগ দিলেও এতে তেমন কোনো কাজ হয়নি। তিনি বলেছিলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্র কেবল নতুন শিল্পে সীমিত রাখার কারণে করদাতাদের কাছ থেকে তেমন আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে অর্থমন্ত্রী হন এম সাইফুর রহমান। পূর্বসূরি শাহ এএমএস কিবরিয়াকে অনুসরণ করে তিনিও কালো টাকাকে সাদা করার দ্বার খুলে দেন।
২০০৯ সালের ১২ জুন বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কালো টাকার পক্ষে যুক্তি দিয়ে একে ‘রাজনীতির কাছে নৈতিকতার পরাজয়’ উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সমঝোতায় এ সুযোগ বারবার দেয়া হচ্ছে। কারণ রাজনীতি হলো আপসের সবচেয়ে নিপুণ কৌশল। রাজনীতিতে সব ধরনের মানুষ ও সব ধরনের স্বার্থকে সমন্বয় করে চলতে হয়। ফলে এবারও সেই সমঝোতার বাইরে যেতে পারছেন না অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কালো টাকার পক্ষে বেশ সাফাই গাইতে শোনা গেছে। বোর্ড চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া প্রাক-বাজেট আলোচনায় তার অভিমত ব্যক্ত করে বলেছেন, এ সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হলে ওই অর্থ পাচার হয়ে দেশের বাইরে চলে যাবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেছেন, জরিমানার বিধান রেখেই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হবে। রিহ্যাব বা আবাসন শিল্প খাতের নেতারা এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে এবারের বাজেটেও আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ চান। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান কালো টাকা সাদা করতে জরিমানার বিধান রেখে এ সুযোগ দেয়া হবে বলে প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে কর ও জরিমানা আদায় করা হয়ে থাকে। প্রতিবারই এটা হয়ে আসছে। যদি আমরা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করে দিই, তাহলে টাকাগুলো বাইরে চলে যাবে। এতে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে আমরা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিচ্ছি। আপনারা এটাকে কেউ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করবেন না। আমরা ট্যাক্স ও জরিমানাসহ এ সুযোগ দিচ্ছি।’
এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। পরবর্তীতে এ লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৪ কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরে এ খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫৯ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরে এ খাতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি এবং সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় তিন গুণ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো ফায়দা পাচ্ছে না রাষ্ট্র বা দেশের অর্থনীতি। ফ্ল্যাট ও জমিতে বিনিয়োগ ছাড়া এ সুযোগ কালো টাকার মালিকরা উৎপাদনশীল খাতে কোনো বিনিয়োগ করেনি। এমনকি শেয়ারবাজারেও তারা যাচ্ছে না। ২০০৭ ও ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভয়ে দেশে কালো টাকা বেশি সাদা করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যেখানে দেশের অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থ কালো টাকা। খুব বেশি অবৈধ অর্থ সাদা না হলেও কালো টাকার মালিকদের আবারও নতুন নতুন সুযোগ হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, ‘সরকারের সাথে যুক্তরাই কালো টাকার মালিক। বিভিন্ন কমিশন বাণিজ্য, নির্মাণকাজ, চুক্তির ক্ষেত্রে কমিশন, ঘুষ, নিয়োগ বাণিজ্য, গ্রেফতার বাণিজ্যের মাধ্যমে কালো টাকা আয় করেন তারা। এর সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারকরাই জড়িত। এ ধরনের আয় যত বাড়ছে, টাকা পাচারও ততই বাড়ছে।’
সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘টাকা পাচার বন্ধে মানি লন্ডারিং আইনে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া আছে। এজন্য ওই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার। এছাড়া কেন মানি লন্ডারিং হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে আমরা বহুদিন ধরেই বলে আসছি। টাকা কালো হওয়ার পেছনে সরকারের নীতিনির্ধারকরাই জড়িত থাকেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এ ধারা অব্যাহত থাকবে।’

Disconnect