ফনেটিক ইউনিজয়
খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে বিএনপি
আনছার আহমেদ

দলীয় চেযারপারসন খালেদা জিয়া শিগগিরই মুক্তি পাবেন, আশাবাদী বিএনপি। তবে তিনি মুক্তি না পেলেও নির্বাচন বর্জন করবে না বিএনপি। দলীয় প্রধানকে কারাগারে রেখেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। যদিও দলটি ঘোষণা দিয়েছে, খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না তারা। কিন্তু দলীয় সূত্র বলছে, এ ঘোষণা সরকারকে চাপে রাখতে। পরিস্থিতি যেমনই থাকুক, ভোট বর্জনের ‘ভুলের’ পুনরাবৃত্তি করবে না বিএনপি।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। হাইকোর্ট চার মাসের জামিন দিলেও, তার শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে। এ মামলায় জামিন পেলেও অন্য দুটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোর কারণে শিগগিরই কারামুক্তির আশা নেই। ২০১৪ সালে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোটের দাবিতে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। সরকারকে পদত্যাগেও বাধ্য করতে পারেনি। বিএনপি নেতাদের বিশ্লেষণেই পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে। এবারও ভোট বর্জন করে নির্বাচন ঠেকানো যাবে না, আওয়ামী লীগ আরেক মেয়াদে বিনাবাধায় ক্ষমতায় আসবে, এ বাস্তবতায় বর্জনের পথ ছেড়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি।
গত ২৮ এপ্রিল কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দলের তিন সিনিয়র নেতা। খালেদা জিয়া তাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন। দলটির পরিকল্পনা হলো, যেকোনো মূল্যে কিছু দাবিদাওয়া আদায় হলে এবং নিজেরা কিছুটা ‘ছাড়’ দিয়ে হলেও আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া। নির্বাচনে অংশ নেয়ার ‘ইঙ্গিত’ দিয়েই কারাগার থেকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আগামী সেপ্টেম্বরের পর ‘বড় আন্দোলনের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। খুলনা ও গাজীপুরে পরাজিত হলেও বড় আন্দোলনে যাবে না তারা।
চলতি বছরের ডিসম্বরের শেষ সপ্তাহে একাদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। ইতিমধ্যেই খুলনা সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার আগে গাজীপুরসহ চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপি এগুলোতে অংশ নেবে। এছাড়া স্থানীয় সরকারের যেখানে যেখানে ভোট হবে, সেখানেই প্রার্থী দেবে। আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এসব ভোটে অংশ নেবে দলটি।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, তাদের মূল দাবি নির্দলীয় সরকার অথবা শেখ হাসিনাকে সরকারের বাইরে রেখে নির্বাচন, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি। নির্দলীয় সরকারের দাবি পূরণ হবে, এ আশা তারা করছেন না। তাদের প্রধান দাবি এখন নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া ও খালেদা জিয়ার মুক্তি। দাবি পূরণ না হলেও নির্বাচনে যাবে বিএনপি।
দাবিদাওয়া আদায়ের প্রশ্নে সরকারকে চাপের মুখে রেখে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ অন্তত কিছু দাবিদাওয়া আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে দলটি। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও ভেতরে ভেতরে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের ঢাকায় কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকারী নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে নেয়া এবং সর্বাত্মক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি সারাদেশে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীর সাংগঠনিক তৎপরতা আরও গতিশীল করার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০ দলীয় জোটকে আরও কার্যকর করার ও জোটের বাইরের দলগুলোকে নিয়ে পৃথক প্ল্যাটফর্ম বা মোর্চা গঠনের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
আগামী নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবেই অংশ নেবে বিএনপি। ভোটের আগে সরকার জোটে ‘ভাঙন’ ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে দলটি। জামায়াতে ইসলামীকে জোট থেকে বের করে নিতে সরকারের ‘চেষ্টা’ রয়েছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন। কোনো জোট সঙ্গী যেন সরকারের কাছ থেকে ‘সুযোগ সুবিধা’ নিয়ে ভোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন না করে, তাও ঠেকাতে হবে বিএনপিকে। বর্তমান জোট সঙ্গীদের ধরে রাখার পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে টানার চেষ্টা করছে বিএনপি। ধর্মভিত্তিক দল ইসলামী আন্দোলনকেও কাছে টানার প্রচেষ্টা রয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সকল বিরোধী দলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়তে চান তারা। চেয়ারপারসনকে কারাগারে রেখে তারা নির্বাচনে যাবেন না। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাতানো নির্বাচন বিএনপি মানবে না।
সরকারের সঙ্গে ‘সংলাপ’কেও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। তবে আওয়ামী লীগ সংলাপে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। বিএনপি চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে সরকারকে আলোচনায় বসাতে। বিএনপির বুদ্ধিজীবী অংশও এ ইস্যুতে কাজ করছে। সরকার বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার চেষ্টা করতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে দলটির। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিএনপির ভরসা। ভোটের আগে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নেরও প্রচেষ্টা রয়েছে। এ কারণে দেশটির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক সই ও বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ইস্যুতে নীরব রয়েছে বিএনপি।
পাশাপাশি ভোটের প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিএনপি। ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চলছে। আসনওয়ারি দলীয় জরিপ করা হচ্ছে। প্রতিটি আসনে তিনজন করে সম্ভাব্য প্রার্থী প্রস্তুত করে রাখা হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন হচ্ছে রাজনৈতিক দলের আসল পরীক্ষা। এ পরীক্ষার জন্য বিএনপি সবসময়ই প্রস্তুত।

Disconnect