ফনেটিক ইউনিজয়
লাগামহীন বজ্রপাতে বাড়ছে মৃত্যুহার
এ আর সুমন

বজ্রপাতে আতঙ্কিত সারাদেশ। গত এপ্রিল ও চলতি মে মাসের কয়েক দিনের বজ্রপাতের কিছু তথ্য চমকে দেয়ার মতো। ৯ মের ঘটনা, ওইদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ২৩ জন মারা যান। পরদিন ১০ মে বজ্রপাতে দেশের সাত জেলায় আটজনের মৃত্যু হয়। এর আগে ৭ মে সারাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় ১১ জনের। একইভাবে ২ মে ১১ জন, ৩০ এপ্রিল ১৫ জন, ১৭ এপ্রিল ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে দানবরূপী বজ্রপাতে। ১০ মে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১২০। গত বছর বজ্রপাতে মৃত্যু হয় ৩৭৯ জনের। এই হলো ভয়াবহ বজ্রপাত তা-বের কিছু খ-চিত্র। অভিযোগ রয়েছে, পরিকল্পিত সরকারি উদ্যোগের অভাবে হতাহতের সংখ্যা কমানো যাচ্ছে না।
দৈনিক সংবাদপত্রে বজ্রপাতে মারা যাওয়ার যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোকে একত্রিত করে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত আট বছরে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি। দেশে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়েছে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। রংপুর বিভাগের মধ্যে ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয়। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত নেত্রকোনায় এবং ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় কিশোরগঞ্জে।
জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা, ভারতের কয়েকটি অংশে এবং নেপালেও বজ্রপাত হয়। তবে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা অনেক বেশি। দেশের আয়তনের তুলনায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক বেশি। বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় রয়েছে, যেখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। এ দুই বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিস্থিতির তৈরি হয় বলে তারা বলছেন। গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা এক ডিগ্রি বাড়লে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বেড়ে যায়। পৃথিবীর যে কয়েকটি অঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ, তার মধ্যে দক্ষিণ-এশিয়া অন্যতম।
বজ্রপাত বাড়ার কারণ হিসেবে পুবালি লঘুচাপ ও বৈশ্বিক উষ্ণতাকে দায়ী করছেন আবহাওয়াবিদরা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. সমরেন্দ্র কর্মকার সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘পুবালি লঘুচাপ-পশ্চিমা লঘুচাপ যেটা আমরা বলে থাকি? মূলত এর প্রভাবেই বজ্রপাতের হার বেড়েছে। ভারতের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে ঢুকে এটি উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের খুলনা জোন দিয়ে প্রবেশ করে। যে বছর এ লঘুচাপ এভাবে প্রবেশ করে, সে বছর বজ্রপাতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বাড়ে।’
এছাড়া বনাঞ্চল উজাড় বা পরিবেশ বিপর্যয়কেও বজ্রপাতে মৃত্যুহার বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ড. সমরেন্দ্র কর্মকার আরও বলেন, ‘বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে আগে বজ্রপাত গাছপালার ওপর পড়ত, তাতে প্রাণহানি ঘটত না। এখন চিত্র পাল্টে গেছে। তবে বজ্রনিরোধক যন্ত্র যদি আমরা ব্যবহার করতে পারি, সেক্ষেত্রে বজ্রপাত থেকে মৃত্যুহার কমিয়ে আনা সম্ভব।’
কথিত আছে, বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে অসংখ্য ধাতুর পিলার বসিয়েছিল। এসব পিলার চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ তথা এ অঞ্চলে বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে দেশের বিভিন্ন এলাকার সীমানায় মাটির নিচে পিলারগুলো পুঁতে রাখা হয়েছিল। পিলারগুলো পিতল, তামা, লোহা, টাইটেনিয়ামসহ চুম্বকের সমন্বয়ে তৈরি ছিল। এ পিলারকে ‘ম্যাগনেটিক পিলার’ বলা হয়। পিলারগুলো বজ্রপাতের সময় উচ্চইলেকট্রিক চার্জ শোষণ করে আর্থিংয়ের কাজ করত বলে ধারণা করা হয়। তাই এ পিলারগুলো যতদিন বহাল ছিল, বজ্রপাত হলেও হতাহত কম হতো। অভিযোগ রয়েছে, সীমানা পিলার মূল্যবান হওয়ায় একশ্রেণির অসাধু মানুষ গভীর রাতে এগুলো তুলে নিয়ে গেছে। তাতে বজ্রপাতে মৃত্যুহার বাড়ার কারণ বলেও ধারণা করেন অনেকে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ভেনিজুয়েলা ও ব্রাজিলে দেখা যায়। কিন্তু সেখানকার তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর ঘটনা অনেক বেশি। খোলা স্থানে মানুষের কাজ করা এবং বজ্রপাতের বিষয়ে অসচেতনতা এর পেছনে অন্যতম কারণ। বজ্রপাতের বেশি শিকার হচ্ছেন খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক বা জেলেরা। বিশেষ করে হাওড়াঞ্চলে খোলা জায়গায় মানুষজন কাজ করার কারণে সেখানে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটছে।
বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টিকে এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই মোকাবেলা করছে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর লক্ষ্যে দেশবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের আটটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেক্টিভ সেন্সর বসিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছাড়াও ময়মনসিংহ, সিলেট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, খুলনা পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামে এ সেন্সর বসানো হয়েছে। তবে এর পরও কিন্তু থেমে নেই বজ্রপাতের আগ্রাসন। তা অন্তত গত দুই মাসের চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে।
আবহাওয়াবিদ ড. শামীম হাসান ভূইয়া বলেন, ‘খোলা মাঠে যখন কাজ করেন, তখন কিন্তু কৃষকই সবচেয়ে উঁচু থাকে, এজন্য সেটা তার শরীরের ভেতর দিয়ে মাটিতে প্রবেশ করে। প্রত্যেক মোবাইল টাওয়ারে বজ্র নিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং এরেস্টা লাগানো আছে। যদি এ টাওয়ারের নিচে বা বিল্ডিংয়ের নিচে কেউ আশ্রয় নেয়, তাহলে সেটা হবে বজ্রপাত থেকে নিরাপত্তা।’
তবে গত কয়েক মাসের টানা বজ্রপাতের ঘটনায় সারাদেশে আতঙ্ক বেড়েছে। অন্যদিকে বজ্রপাত মোকাবেলায় তেমন কোনো সরকারি ভূমিকা দেখা যায়নি বলেও জানিয়েছেন অনেকে। সরকারি উদ্যোগ বলতে প্রাণহানি কমিয়ে আনতে সারাদেশে ১০ লাখ তাল গাছ লাগানোর প্রকল্পে কাজ করছে ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তবে এমন দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে বর্তমানের পরিস্থিতি মোকাবেলায় মোটামুটি ব্যর্থ বলেও দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বজ্রপাতে মৃত্যুর ৯৯ শতাংশই ঘটেছে বাইরে খোলা আকাশের নিচে থাকার কারণে। তাই একটু সচেতনতাই পারে এ মৃত্যু ঠেকাতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখনই আকাশ একটু মেঘলা দেখা যাবে, তখনই যথাসম্ভব খোলা আকাশের নিচ থেকে চলে আসতে হবে। বড় গাছ, টিনের ঘর, বৈদ্যুতিক খুঁটি ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। পারলে ইটের বা মাটির ঘরে ও ছাদের নিচে চলে আসতে হবে। মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, টিভি ইত্যাদি বন্ধ করে দিতে হবে।

Disconnect