ফনেটিক ইউনিজয়
মহাশূন্যে বাংলাদেশ: বিতর্ক অবসানে স্বচ্ছতার প্রত্যাশা
জাকারিয়া পলাশ

বঙ্গবন্ধু কমিউনিকেশন্স স্যাটেলাইট-১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহটি সফলভাবেই মহাশূন্যে পরিভ্রমণ করছে। এরই মধ্য দিয়ে ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যুক্ত হলো স্পেস এইজ বা মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে। ৭ হাজার ৭০০ পাউন্ডের এ ভূ-উপগ্রহটির মালিক বাংলাদেশ। ১১ মে মধ্যরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ প্যাড থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ সঙ্গে নিয়ে রওনা হয় ফ্যালকন-৯ (ই-কে ফাইভ) নামের রকেটটি।
নানা দিক দিয়ে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের জন্য এটি বড় মাপের অর্জন সন্দেহাতীতভাবেই। সাফল্যের সুখানুভূতির সঙ্গে সঙ্গেই এ অর্জন নতুন দায়বদ্ধতার মুখে দাঁড় করিয়েছে বাংলাদেশকে। সেগুলো নিয়ে কিছু জনপ্রত্যাশা ও বাস্তবতা তুলে ধরার আগে পাঠকের সুবিধার্থে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু জরুরি তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন।

এক নজরে বঙ্গবন্ধু-১
২০০৮ সালে টেলিযোগাযোগ খাতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি একটি কমিটি গঠন করে। ২০০৯ সালে নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিটের (আইটিইউ) কাছে ইলেক্ট্রনিক আবেদন করে বাংলাদেশ। নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনালকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে ১ হাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি। ২০১৫ সালে বিটিআরসি রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনার আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে, যার অর্থমূল্য ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনার জন্য একনেক সভায় ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেয়া হয় ১ হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এছাড়া বিডার্স ফিন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সাথে সরকারের প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি হয়। ১ দশমিক ৫১ শতাংশ সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

কী কাজে আসবে
স্যাটেলাইটে রয়েছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এর মধ্যে ২৬টি কে ইউ-ব্যান্ড ও ১৪ টি সি-ব্যান্ডের। ওই ট্রান্সপন্ডারগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। এ কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশ ছাড়াও সার্কভুক্ত সব দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আওতায় আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় এ স্যাটেলাইট দিয়ে সেবা দেয়া সম্ভব হবে না।
এখন দেশে সম্প্রচারে আছে প্রায় ৩০টি স্যাটেলাইট চ্যানেল। এসব চ্যানেল সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে আসছিল, বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে গুনতে হয় বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার (১১৮ কোটি টাকা)। তথ্যমতে, কয়েক মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু-১ ব্যবহার করে এ কাজগুলো করতে পারবে বাংলাদেশ। এ স্যাটেলাইটের জীবৎকাল ধরা হয়েছে ১৫ বছর। সে হিসাবে আগামী ১৫ বছর এ খরচগুলো বাংলাদেশের সাশ্রয় হওয়ার কথা।
এছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার অন্য দেশের কাছে ভাড়া দিয়েও বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ থাকবে। ৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি ভাড়া দেয়ার জন্য রাখা হবে। এরই মধ্যে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দেয়ার জন্য সরকারের গঠন করা বঙ্গবন্ধু কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি (বিসিএসবি) লিমিটেড কাজ শুরু করেছে।
দেশের ৭৫০ ইউনিয়নে এখন ফাইবার অপটিক ইন্টারনেটের সংযোগ নেই। ইন্টারনেটবঞ্চিত এমন এলাকার মধ্যে রয়েছে পার্বত্য ও হাওরাঞ্চল। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। ঝড় বা বড় ধরনের দুর্যোগে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতেও কার্যকর হবে এ স্যাটেলাইট। সব মিলিয়ে এ স্যাটেলাইটের জন্য যে টাকা খরচ হয়েছে, সাত বছরের মধ্যে সে খরচ উঠে আসবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার।
তবে সংশ্লিষ্টরা এরই মধ্যে এ স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে দুটো চ্যালেঞ্জকে চিহ্নিত করেছেন। বলা হচ্ছে, স্যাটেলাইটের অবস্থান ও দূরত্বের কারণে কিছু চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলো বর্তমানে অ্যাপস্টার নামে যে স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে, সেটি বাংলাদেশের উপরে ৯০ ডিগ্রিতে অবস্থান করছে। এর মাধ্যমে একদিকে দুবাই এবং অন্যদিকে মালয়েশিয়া পর্যন্ত সম্প্রচার সম্ভব হয়। এ বিষয়ে ৭১ টিভির নির্বাহী মোজাম্মেল হক বাবু সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান হবে ইন্দোনেশিয়ার ওপর ১১৯ ডিগ্রিতে এবং বাংলাদেশ থেকে ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে এ স্যাটেলাইট থাকবে। ফলে এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছা সম্ভব হবে না। আরেকটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছতে হবে। জানা গেছে, তিন মাসের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বাংলাদেশের চ্যানেলগুলো এটা ব্যবহার করবে। পরে ভালো মান পেলেই তারা বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হবে।

বঙ্গবন্ধু-১-এর বর্তমান অবস্থা
নিজ কক্ষপথে পৌঁছেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। উপবৃত্তাকার পথে ঘুরে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। মহাশূন্যে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নির্ধারিত অবস্থানে পৌঁছবে। এ পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে ৯ থেকে ১৯ দিন। আশা করা হচ্ছে, ১২ দিনের মধ্যেই এটি কক্ষপথে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে এমন তথ্যই জানানো হয়েছে বাংলাদেশকে। এ তিনটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকেই সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে যাওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ শুরু হবে গাজীপুর ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে। এরই মধ্যে গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশনে সিগনালও এসেছে। সেখান থেকে এর অবস্থান দেখা যাচ্ছে। স্যটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাঙামাটির বেতবুনিয়া ও গাজীপুরের জয়দেবপুরে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। অরবিট স্লটে পুরোপুরি সেট করে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ পেতে অন্তত ২০ দিন লাগবে বলে জানানো হয়েছে। স্যাটেলাইটের দেখভালের দায়িত্ব নেবে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসবি)। এ সংস্থার প্রাথমিক মূলধন হিসেবে এরই মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

মালিকানা বিতর্ক ও জনপ্রত্যাশা
এসব অগ্রগতির পরও প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পৃক্ত বিদেশি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে স্যাটেলাইটের পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটুকু? আর্থিকভাবে বাংলাদেশের সাশ্রয় ও ব্যয়ের তুলনামূলক তথ্যাবলি, বেসরকারি খাতের কোন প্রতিষ্ঠান কী প্রক্রিয়ায় এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে? এর রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলো পরিচালনা ও লোকবলের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে কী পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে? এসব তথ্য এখন স্পষ্ট হওয়া জনগণের প্রত্যাশা। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষণীয়ভাবেই ছিল এসব জনপ্রত্যাশা।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও এসেছে উৎক্ষেপণের আগেই স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ ও সিগনাল বেচাকেনা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টির খবর। সম্প্রতি নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কনস্যুলেটে আয়োজিত বিটিআরসির এক সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো হয়, স্যাটেলাইট সিগনাল ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দের দায়িত্বে থাকবে দুটি প্রতিষ্ঠান। এরা হলো, বেক্সিমকো গ্রুপ ও বায়ার মিডিয়া লিমিটেড। এ নিয়ে তখন থেকেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৪০টির মধ্যে ১২টি ট্রান্সপন্ডার বরাদ্দ রয়েছে ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম) কোম্পানিগুলোর জন্য। জানা গেছে, দুটি কোম্পানি এ ১২টি ট্রান্সপন্ডারের বরাদ্দ পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে ৭১ টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল বাবু সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, দুটি কোম্পানি যদি এ স্যাটেলাইট ভাড়া না নেয়, তাহলে এটির অর্ধেক অব্যবহৃত থেকে যাবে। এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘অন্যান্য টেলিভিশনগুলো বিভিন্ন স্যাটেলাইট থেকে সার্ভিস নেয়। সমস্ত টেলিভিশন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে চলে আসবে। এটির জন্য তাদের বেক্সিমকো বা বায়ার মিডিয়ার পারমিশন নিতে হবে না। শুধু ডিটিএইচ সেবা দেবে এ দুই প্রতিষ্ঠান।’ তিনি আরও জানান, দুই বছর আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে।
অর্থাৎ স্যাটেলাইটের চারটি বিশেষ ধরনের সেবার একটি (ডিটিএইচ) সেবা দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেয়া হয়েছে। আর এজন্য বরাদ্দ রয়েছে দেশের জন্য বরাদ্দকৃত ২০টির মধ্যে ১২টি ট্রান্সপন্ডার। এই ডিটিএইচ সেবা কী? কোন প্রক্রিয়ায়, কেনই বা এ সেবার দায়িত্ব ওই দুটি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হলো, তা স্পষ্ট করা এখন সরকারের দায়িত্ব। প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে বিভিন্ন ফোরামে এমন আলোচনা উঠেছে যে, স্যাটেলাইটে বিনিয়োগের চেয়েও বেশি কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে এই ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যেত কিনা। সমালোচকদের এমন প্রশ্নের কার্যকর জবাব দিতে হলে অবশ্যই সরকারকে স্বচ্ছভাবেই বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহের তথ্যাবলি স্পষ্ট করতে হবে।

Disconnect