ফনেটিক ইউনিজয়
বাম্পার ফলনেও কৃষকের কান্না
এমডি হোসাইন

চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় এবং বিভিন্ন জেলার ফসল রক্ষার বাঁধ নির্মাণে জেলা প্রশাসনের নজরদারিতে ফসল ঘরে তুলতে পারলেও ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না সাধারণ কৃষকরা। প্রতিবারের মতো এবারও সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে এখনও ধান সংগ্রহ না করার কারণে কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। শুধু চাল সংগ্রহ শুরু হওয়ায় কৃষকেরা বঞ্চিত রয়েছেন তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে। কারণ চাল দিচ্ছেন শুধু চাতালকল মালিকেরা। এতে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের পরও আনন্দের পরিবর্তে কৃষকের চোখে-মুখে যেন কান্নার ছাপ।
উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে নেক ব্লাস্টসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরও ধানের ব্যাপক ফলন হয়েছে। কিন্তু বাজারদর কম থাকায় হতাশা নিয়েই গোলায় ধান তুলছেন কৃষকরা। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, কুড়িগ্রাম জেলার মাঠে মাঠে কৃষক-কৃষাণী ব্যস্ত ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার কাজে। এসব জেলায় বিগত সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন হয়েছে। তবে কুড়িগ্রাম জেলার কৃষক আবুল কালাম আজাদ জানান, ২৮ জাতের ধানের চাল চিকন ও সুগন্ধি হওয়ায় দেড় বিঘা জমিতে তিনি আবাদ করেছিলেন, কিন্তু নেক ব্লাস্ট আক্রমণে উৎপাদন অন্যদের মতো ভালো হয়নি। তার পরও গত বছরের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে।
আনিসুর রহমান নামে এক কৃষক জানান, ধান উৎপাদন ভালো হলেই কৃষকরা খুশি হতে পারেন না। ধানের দামও থাকা চাই। বাজারে ধানের দাম মণপ্রতি ৫৫০-৬০০ টাকার বেশি নয়। এ দরে বিক্রি করলে খরচও উঠবে না বলে জানান তিনি। কৃষি শ্রমিকের সংকট হওয়ায় অধিক মজুরি দিয়ে ধান কাটতে হচ্ছে। তবে উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ জেলার মাটি ও আবহাওয়া বোরো চাষে উপযোগী হওয়ায় বোরো আবাদই এখানকার কৃষকের একমাত্র ভরসা। তাই ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন কৃষকেরা।
কুড়িগ্রাম জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান বলেন, ‘চলতি বছর এ জেলায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৪৭ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৪৩০ টন। নেক ব্লাস্টসহ বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরও আমরা আশা করছি, উৎপাদন লক্ষ্য অর্জিত হবে।’
জানা যায়, গত ২ মে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান-চাল ক্রয় কার্যক্রম শুরু করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে মাত্র এক সপ্তাহ আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় কার্যক্রম। ফলে কৃষকেরা জীবনযাপনের তাগিদে স্বল্পমূল্যে স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে ধান-চাল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরপর কয়েক বছর ফসল হারিয়ে মহাবিপদে পড়েছিলেন হাওরপাড়ের কৃষকেরা। সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে গুদামগুলোয় সঠিক সময়ে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না করায় স্বল্পমূল্যে স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করতে হয়েছে কষ্টার্জিত সোনালি ধান। ধান কাটতে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি অর্থসংকটেও আছে কৃষকেরা।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নানা সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে শ্রমিকের মজুরি ও ঋণ পরিশোধ এবং পরিবারের চাহিদা পূরণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে মণপ্রতি ৫৫০-৬০০ টাকা দামে ধান বিক্রি করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কৃষকেরা। সঠিক সময়ে সরকারিভাবে খাদ্যগুদামগুলোয় ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু না করায় কৃষকদের মাঝে চরম হতাশাও রয়েছে। চলতি বছর সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে ২৬ টাকা কেজি দরে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার। তবে প্রকৃত কৃষকেরা ধান গুদামে বিক্রি করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের।
কিশোরগঞ্জের কৃষক সুমন আলী বলেন, ‘সরকার এ বছর কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে দেরি করায় স্বল্পমূল্যেই স্থানীয় বেপারিদের কাছে মণপ্রতি ৫৫০-৬০০ টাকা দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। আর সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দিতে গেলেও ধরতে হয় বিভিন্ন দালাল ও সরকারি দলের নেতাদের।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত দুই বছর ফসল হারিয়ে এবার মোটামুটি ভালো ফসল পেয়েছি, কিন্তু ধানের সঠিক মূল্য না পাওয়ায় খরচই ওঠানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ জেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দীপক তালুকদার বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি, কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে যদি কৃষকদের তালিকা তৈরি করা যেত, তাহলে প্রকৃত কৃষকেরাই গুদামে সরাসরি ধান বিক্রি করে লাভবান হতেন।’ সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুর রউফ জানান, ধান কেনার সিদ্ধান্ত এখনও পাওয়া যায়নি। তাই এখনও ধান কেনা শুরু করতে পারছেন না। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার সাথে সাথে ধান কেনা শুরু করা হবে।
জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রকৃত কৃষকেরা গুদামে সরাসরি ধান দিতে পারেন না একশ্রেণির দালালের কারণে। সরকারের পক্ষ থেকে এর মনিটরিং করার দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিরা।
কৃষিবিদরা বলেন, প্রকৃতির সাথে কৃষকরা লড়তে পারেন। কিন্তু বাজারের কূটকৌশলের সাথে পারেন না, মজুদদারদের সাথে পারেন না। এখানেই সরকারের দায়িত্ব। সরকারকে সহমর্মিতা নিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে। অবশ্য সরকার বলছে, এরই মধ্যে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান চলছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ২ মে শুরু হওয়া এ অভিযান চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এ সময়ে ৩৮ টাকা কেজি দরে নয় লাখ টন চাল ও ২৬ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন ধান কেনার লক্ষ্য সরকারের। এ পুরোটাই যদি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনা যেত, তাহলে সত্যি সত্যিই কৃষকের মুখে হাসি ফুটত। কিন্তু এখানেই মার খেয়ে যান কৃষকেরা। কারণ সরকারের গুদাম পর্যন্ত যেতে পারেন না প্রান্তিক কৃষকরা। চাতাল মালিক আর মধ্যস্বত্বভোগীরা খেয়ে নেয় লাভের গুড়টুকু।

Disconnect