ফনেটিক ইউনিজয়
পদ্মা সেতুর খরচ বেড়েই চলেছে
দেলোয়ার হোসাইন

নিজস্ব অর্থে পদ্মা নদীর ওপর সেতু হচ্ছে। সেতুর কাজ এগোচ্ছে, সেই সঙ্গে ব্যয়ও বাড়ছে। কয়েক দফায় খরচ প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। সেতুতে পাইলের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি মূল সেতুর খরচ আরও ১৮০ কোটি টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া সেতুর রেল সংযোগেও খরচ বেড়েছে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এতে সেতুর রেল সংযোগে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। শুরুতে এ খাতে খরচ ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
জানা যায়, লোড টেস্ট-৩ হচ্ছে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ (ক্রিটিক্যাল)। সাধারণত পাইলের সক্ষমতা বিবেচনায় সব লোড কেসের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সহনশীল মাত্রা থাকে। আর লোড কেস-৩-এর ক্ষেত্রে নিরাপত্তার শেষ প্রতিরোধের ফ্যাক্টর (এফওএস) হিসেবে মূল ডিজাইনে নির্দিষ্টকৃত ২.৪ মিটারের পরিবর্তে ১.৭৫ মিটার বিবেচনায় নিতে হবে। সব মিলিয়ে সেতুর পাইল রি-ডিজাইনে দৈর্ঘ্য ও সংখ্যার পরিবর্তনে খরচ বাড়ছে। সম্প্রতি ব্যয় বৃদ্ধিজনিত আর্থিক অনুমোদন নিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। সেখানে ২২টি পাইলের জন্য ১৮০ কোটি টাকা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যয় বৃদ্ধি সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আগে অনুমানের ওপর নির্ভর করে প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। তখন বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল প্রাক্কলন ছিল না। তাই এখন নতুন করে বাস্তবসম্মত ব্যয় বেড়েছে। সরকারি তহবিলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া, ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ ও পরামর্শক সেবার খরচ বেড়ে যাওয়া, নির্মাণকাজ ও বাস্তবায়ন ইউনিটের জন্য অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়া, যানবাহন ক্রয় খাতে খরচ কমে যাওয়া এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বা অতিরিক্ত দুই বছর বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধন করা হচ্ছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। নির্মাণকাজ ৬১ ভাগ শেষ হয়েছে। কিছু পাইলের রি-ডিজাইনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করা হবে। আশা করি, সমস্যা থাকবে না। খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রি-ডিজাইনে কিছু খরচ বাড়তে পারে। তবে মূল প্রকল্পের ব্যয় বাড়বে না। কারণ চুক্তির সময় এ খাতে বাড়তি খরচ ধরা থাকে।
প্রকল্পটির যাত্রা হয়েছিল ২০০৭ সালে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প পাস করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এতে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। এরপর আরও কয়েক দফায় খরচ প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে।
জানা যায়, মূলত নদী শাসনের কাজেই ব্যয় বেড়েছে বেশি। ২০১১ সালের প্রাক্কলনে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৪ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। ৫ হাজার কোটি টাকা বেড়ে এখন তা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়। প্রাথমিকভাবে আট কিলোমিটার নদী শাসনের কথা থাকলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩ কিলোমিটার। বাড়তি ১.৩ কিলোমিটারের জন্য ব্যয় বেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। ২০০৭ সালের মূল প্রকল্পে নদী শাসনে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। জাজিরা ও মাওয়া অংশে সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এরিয়া ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ খরচ মূল প্রকল্পে ঢুকে গেছে। আগে ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) অর্থায়নে আলাদাভাবে এ অবকাঠামো তৈরির কথা ছিল। জাজিরা অংশে সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো তৈরি করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে মাওয়া অংশে সংযোগ সড়ক ও অন্য অবকাঠামো তৈরি করতে ১৯৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সার্ভিস এরিয়া নির্মাণে খরচ ২০৮ কোটি টাকা। ২০১১ সালের প্রাক্কলনে পুনর্বাসন বাবদ খরচ আরও ১০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। ২০০৭ সালে এ খাতে খরচ ধরা হয়েছিল ৫২৮ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণেও খরচ বাড়ানো হয়েছে। ২০০৭ সালে যেখানে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০৬ কোটি টাকা, পরে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। ২০১১ সালে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। তবে পরামর্শক, কর্মীর বেতন, যানবাহন, শুল্ক-করসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় কমেছে। ২০০৭ সালে যেখানে এসব খাতে খরচ ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা, কয়েক বছর পর তা কমিয়ে ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা করা হয়। এছাড়া মালামাল পরিবহনের সুবিধার্থে বর্তমান সড়ক চওড়া করা, ফেরিঘাট স্থানান্তরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে নতুন করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪০৮ কোটি টাকা। এভাবে বিভিন্ন খাতে সংস্কার পদ্ধতির মাধ্যমে পদ্মা সেতুর খরচ বেড়েই চলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা হলেও সময়ে সময়ে ব্যয় বৃদ্ধির সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়বে বলেও তারা মনে করেন। বঙ্গবন্ধু সেতুর (যমুনা সেতু) অর্থনৈতিক মূল্যায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা একাধিক কর্মকর্তা ব্যয়ের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু সেতুর (যমুনা সেতু) শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত কী পরিমাণ ব্যয় বেড়েছিল, সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেত। প্রকৃত দর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সেই সেতুর খরচ প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এতে ব্যয় ৮-৯ শতাংশের বেশি বাড়েনি। কিন্তু পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরুর আগে তিন গুণের বেশি ব্যয় বেড়েছে। এটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। যেকোনো নাগরিক এতে উদ্বেগ প্রকাশ করবে।

Disconnect