ফনেটিক ইউনিজয়
আইনি দুর্বলতায় মাদকের বাড়বাড়ন্ত
জয়নাল আবদিন

সারা দেশে গত ১৮ মে থেকে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ১৩০ জন নিহত হয়েছেন। প্রতিদিন নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। প্রচলিত আইন ও তার প্রয়োগের দুর্বলতায় মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ আইনকে পাস কাটিয়েই চলছে মাদকবিরোধী অভিযান। যার ফলাফল বিচারবহির্ভূত হত্যা, যা কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এখন প্রশ্ন হলো, সারা দেশে মাদকের এত প্রসার হলো কীভাবে?
মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছেন, তারা ব্যবসায় জড়িত থাকলেও কেউই কিন্তু গডফাদার নন। যদিও গডফাদারদেরও বিচারবহির্ভূত হত্যা করা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। মাদকবিরোধী সংস্থা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে পরিস্থিতির এত অবনতি কীভাবে হলো? গ্রামগঞ্জে পাড়ামহল্লায় শহরের অলিগলিতে মাদকের সহজলভ্যতা সমাজকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে। মাদক উৎপাদনকারী, মাদক আমদানিকারক, মাদকের আড়তদার, মাদকের গডফাদার সবাইকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে এ সর্বনাশা রোগের উপশম হবে না। আইনি দুর্বলতা আর আইন প্রয়োগের দুর্বলতাই দেশব্যাপী মাদকের রমরমা বাণিজ্যের জন্য বহুলাংশেই দায়ী।
সারা দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭০ লাখেরও বেশি। এ মাদকাসক্তদের মধ্যে ৯০ শতাংশই কিশোর ও যুবা। দেশের এ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মাদকের সমুদ্রে এভাবে ডুবে যাবে, আমরা তা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত দুর্বল। যে ইয়াবা নিয়ে এত হইচই, সে ইয়াবা মাদকদ্রব্যের তালিকায়ই নেই। আইনে মাদকদ্রব্য সংজ্ঞায়িত করার দুর্বলতার কারণে গ্রেফতারকৃতরা সহজে জামিন পাচ্ছে। জামিন নিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে মাদক ব্যবসায়, মাদক বহনে। বড় মাদক কারবারিদের তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছুঁতেই পারে না। আইনের ফাঁকফোকরে ধৃতরাও ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেক সরকারের আমলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের একটা অংশ মাদক ব্যবসার হাল ধরে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও মাদকের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারে না।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন একটি বিশেষ আইন। কিন্তু এ আইনে অপরাধের বিচারে সামগ্রিকভাবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করা হয়। জামিন, তদন্ত, বিচার- সর্বক্ষেত্রেই ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করার কারণে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। আসামি জামিনে গিয়ে আবারও মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়। তদন্তে ব্যয় করা হয় দীর্ঘ সময়। তদন্তের বহু ত্রুটির মধ্যে মারাত্মক ত্রুটি হচ্ছে, যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য আসামির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়, সেই পরিমাণ জব্দ তালিকায় উল্লেখ না করে কম পরিমাণ লিখে অভিযোগপত্র দাখিল করা হচ্ছে। পরিণামে আসামি সহজে জামিন পাচ্ছে। সহজে খালাস পাচ্ছে। আইনকের তোয়াক্কা না করেই মাদকের অন্ধকার জগতে নিজেরা ডুবছে, আর সমাজকে বিপজ্জনক করে তুলছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মাদককে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। আবার এক একশ্রেণির রয়েছে একাধিক উপবিভাগ। বিভিন্ন শ্রেণির মাদকের জন্য নানা ধরনের সাজা এ আইনের প্রয়োগকে অত্যন্ত জটিল করেছে। যেমন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ অনুসারে, হেরোইন, কোকেন ও কোকা উদ্ভূত মাদকদ্রব্য-সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য দুই ধরনের সাজার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ধরন- মাদকদ্রব্যের পরিমাণ অনূর্ধ্ব ২৫ গ্রাম হলে সাজা অন্যূন দুই বছর এবং অনূর্ধ্ব ১০ বছর কারাদণ্ড। আবার মাদকদ্রব্যের পরিমাণ ২৫ গ্রামের ঊর্ধ্বে হলে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। প্রশ্ন হচ্ছে, নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্যের পরিমাণের কম-বেশির ভিত্তিতে সাজার প্রক্রিয়া, বিচার তথা আইনি দুর্বলতাকেই প্রকট করে বিচার ব্যাহত করে। আইনে উল্লেখিত ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির মাদকদ্রব্য-সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য সাজার পরিমাণ এত অল্প যে, স্বল্পমেয়াদের সাজা ভোগ করে মুক্তি পাওয়ার পর অপরাধীরা মাদক বাণিজ্যে জড়াতে উৎসাহী হয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছেন। আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের মাধ্যমে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধ করা না গেলে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়া মাদক অপরাধ কোনোদিনই নির্মূল হবে না। তাই সর্ব্রাগে প্রয়োজন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সময়োপযোগী সংশোধন ও কঠোর প্রয়োগ।

Disconnect