ফনেটিক ইউনিজয়
ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ পথে পথে
আনছার আহমেদ

প্রতি বছর ঈদযাত্রায় অশেষ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সরকারের তরফ থেকে আশ্বাস থাকলেও এবার ভোগান্তি কম হবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। ভাঙাচোরা মহাসড়ক ও ট্রেনে যাত্রীদের প্রবল চাপে ভোগান্তিটাই যেন স্বাভাবিক! দুর্ভোগের আশঙ্কা সঙ্গী করেই যাত্রীরা ছুটছেন নাড়ির টানে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের  ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এইচডিএম) সর্বশেষ হিসাবে সারাদেশের প্রায় পৌনে চার হাজার কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের ৮০০ কিলোমিটারই ভাঙাচোরা। ২৩৯ কিলোমিটারের অবস্থা খুবই খারাপ। আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯২০  কিলোমিটার কমবেশি ভাঙাচোরা। ২৯৪ কিলোমিটার চলাচলের অযোগ্য। জেলা সড়কের অবস্থা আরও খারাপ। প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার জেলা সড়ক খানাখন্দে ভরা, ভাঙাচোরা।
তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘রাস্তার কারণে ঈদযাত্রায় যানজট হবে না। ফিটনেসবিহীন গাড়ির কারণে ঈদযাত্রায় যানজট হতে পারে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল উৎসমুখে বন্ধে অভিযান চলছে। ঈদের সময় সড়কে কিছুতেই ফিটনেসবিহীন যান চলাচল করতে দেওয়া হবে না।’
এ আশ^াস কতটা কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত নয়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রতি বছর আশ^াস দেয়া হয় ঈদযাত্রায় দুর্ভোগ সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। কিন্তু প্রতিবার শেষ পর্যন্ত অশেষ দুর্ভোগ হয়। ৫ ঘণ্টার পথে ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে।’
মহাসড়কে যেমন তেমন, এবারও দুর্ভোগে ভয় রয়েছে ঢাকার উপকণ্ঠে। রাজধানীর ব্যস্ত প্রবেশ পথগুলো পেরিয়ে দুর্ভোগে পড়তে হয় উপকণ্ঠের যানজটপূর্ণ মহাসড়কে। রাজধানী ছাড়তে ও উপকণ্ঠ এলাকা পেরোতে চার থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে সময় আরও বেশি লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রাজধানী থেকে বেরোনোর চার পথ- টঙ্গী সেতু, গাবতলী সেতু, বাবুবাজার সেতু ও কাঁচপুর সেতু। টার্মিনালগুলো থেকে নগরীর সীমানা চিহ্ন হিসেবে পরিচিত এ সেতুগুলোতে যেতেই এক-দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগছে। সেতু পেরোনোর পরও স্বস্তির পরিবেশ নেই। বরং শিল্পঘন উপকণ্ঠে দুর্ভোগ আরও বেশি।
কাঁচপুর থেকে মেঘনা সেতু ও ভুলতা, টঙ্গী সেতু থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা, গাবতলী সেতু থেকে চন্দ্রা মোড়, বাবুবাজার থেকে মাওয়া- এই পাঁচ পথ রাজধানীকে ৬৩ জেলার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ঢাকা ছাড়ার এই পাঁচ পথে যানবাহনের চাপ সারা বছর ধরেই থাকে। গাড়ি চলে ধীরে। ঈদের ব্যস্ত সময়ে যানজটে স্থবির হয়ে যায় ঢাকা ছাড়ার এই পাঁচ রাস্তা। উন্নয়নকাজ, রাস্তার দুই পাশজুড়ে অবৈধ বাজার, শিল্প এলাকার পার্কিংয়ের কারণে পথ চলা দায়। উন্নয়ন কাজ ৮ জুন থেকে বন্ধ থাকলেও বৃষ্টির ফলে দুর্ভোগ বেড়েছে। সওজ অধিদপ্তরের ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম সোমবার সওজের গণশুনানিতে এ চিত্র তুলে ধরেন। সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলাম ও সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসানও স্বীকার করেছেন, ঢাকার উপকণ্ঠের পথগুলো ব্যস্ত, ভাঙাচোরা। খোরশেদ আলম বলেছেন, ‘ঢাকা থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কোনো মহাসড়কের পাশে এক ফুট জায়গা ফাঁকা নেই। শিল্প-কারখানা, বাজার, দোকানপাট, বাড়িঘর, পার্কিং গড়ে উঠেছে। রাস্তা থেকে বৃষ্টির পানি নেমে যেতে এক ফুট জায়গা নেই। এর পরও ভালো সড়কের আশা করাই বোকামি।’
রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে উৎকণ্ঠ এলাকায় সড়কে দুরবস্থা লেগেই রয়েছে। স্বস্তি নেই কাঁচপুর সেতুর পেরিয়ে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা সেতু পর্যন্ত। ব্যস্ততম এ মহাসড়কে যানজট লেগেই আছে শিল্পঘন এলাকায় রাস্তার দুই পাশে পার্কিং, গাড়ির চাপ ও দুই লেনের সেতুর কারণে। কাঁচপুর থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত, ১৬ কিলোমিটার পথে সময় লাগছে দু-তিন ঘণ্টা, দাউদকান্দি সেতু এলাকাও যানজট প্রবণ একই কারণে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট নিরসনে গত ২৭ মে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি সভায় জানান, মেঘনা ও গোমতী সেতুতে সমস্যা রয়েছে। সেগুলো আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
গত ৯ মের সভায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাতটি পয়েন্টকে যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর পাঁচটিই ঢাকার উপকণ্ঠ অংশে। রাজধানী থেকে বেরিয়েই এসব পয়েন্টে যানজটে পড়তে হয়। সড়ক পরিবহন সচিব জানিয়েছেন, যানজটপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এবারের ঈদে যানজট সহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে তিনি আশাবাদী।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, রাজধানী থেকে গোমতী সেতু পর্যন্ত সড়ক ব্যস্ত এলাকা। শিল্প এলাকার গাড়ি রাস্তার পাশে রাখা হয়। এতে দুর্ভোগ হচ্ছে। মহাসড়ক চারলেনের হলেও সেতুগুলো দুই লেনের। এ কারণে টোল প্লাজায় যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যমান দুই লেনের সেতুর পাশে নতুন তিনটি সেতুর কাজ শেষ হবে। কাজ শেষ হলে আর দুর্ভোগ থাকবে  না।
গাবতলী সেতুর পর থেকে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের আমিনবাজার থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত রাস্তায় ভাঙাচোরা না থাকলেও সড়কে গাড়ির চাপ অনেক বেশি। চন্দ্রার পর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। এ কারণে এ অংশে যানজটের দুর্ভোগ লেগেই রয়েছে। এ পথই উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলাকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করেছে। গত ঈদে এ মহাসড়কে ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট ছিল। চারলেন ও ফ্লাইওভারের কাজ শেষ না হওয়ায় এবারও একই রকম ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা-রংপুর পথের ‘আগমনী পরিবহন’-এর ব্যবস্থাপনা পরিবচালক (এমডি) মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, গাবতলী থেকে চন্দ্রা মোড় রাস্তা খারাপ হলেও শিল্প এলাকার পার্কিং ও গাড়ির চাপে বাস ধীরে ধীরে চলে। চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত নির্মাণাধীন চার লেনের কারণে ঢাকা থেকে রংপুর যেতে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। গাবতলী থেকে চন্দ্রা হয়ে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটারে লাগে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। চাপ বাড়লে ১০ ঘণ্টাও লাগে।
দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ বাস ঢাকা থেকে গাবতলী সেতু হয়ে সাভার পেরিয়ে মানিকগঞ্জের আরিচা হয়ে চলাচল করে। উত্তরবঙ্গের মতো সাভার পর্যন্ত একই দুর্ভোগ সইতে হয় দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের। এরপর আরিচা ঘাটে পদ্মা নদী পারাপারে ফেরি পার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কখনও কখনও সাত-আট ঘণ্টা সময় লাগে শুরু ফেরির সিরিয়াল পেতেই। গত শুক্রবারও ১০ কিলোমিটার যানজট ছিল ঘাট এলাকায়।
বরিশাল বিভাগসহ দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের বড় একটি অংশ বাবুবাজার সেতু হয়ে মাওয়া ঘাট দিয়ে ঢাকা ছাড়েন। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। এ মহাসড়কের পাশে শিল্প এলাকা নেই। পার্কিং সমস্যা নেই। কিন্তু নির্মাণকাজ ও স্থানে স্থানে বাজারের কারণে গাড়ির গতি কম। ঘাটে অপেক্ষার ভোগান্তিও রয়েছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের যাত্রীদেরও কাঁচপুর সেতু পেরিয়ে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা হয়ে যেতে হয়। কাঁচপুর থেকে ভুলতার দূরত্ব মাত্র ১১ কিলোমিটার। কিন্তু পুরো পথের দুই পাশেই শিল্প এলাকা। সিলেটের যাত্রী ও চালকরা জানিয়েছেন, ব্যস্ত সড়কে এমনিতেই গাড়ি চলে ধীরে। ভুলতায় ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজের কারণে গাউছিয়া মার্কেটের সামনে ব্যস্ত সড়কের দুই লেনে যান চলাচল করে। তাতে ১১ কিলোমিটার পথ যেতে তিন-চার ঘণ্টা সময় লাগে। ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ আপতত বন্ধ থাকলেও কাঁচপুর থেকে ভুলতা পর্যন্ত গাড়ির গতি বাড়েনি। ঈদযাত্রায় গাড়ির চাপ বাড়ায় যানজটও বেড়েছে।
টঙ্গী সেতুর পর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা অংশে প্রতি বছরই দুর্ভোগ হয়। টঙ্গী থেকে চৌরাস্তা ১৩ কিলোমিটার পথ পার হতে এখনই সময় লাগছে তিন-চার ঘণ্টা। গতবার ঈদের সময় আট ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। এবারও একই আশঙ্কা রয়েছে। বাস র‌্যাপিট ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের কাজ চলছে এ ১৩ কিলোমিটার পথে। দুই পাশে ড্রেন নির্মাণকাজ চলছে। জলাবদ্ধতা ও মাটির কাজ আপাতত বন্ধ থাকলেও যানজট লেগেই আছে টঙ্গী থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত। কখনও কখনও পুরো রাস্তায় যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে।

Disconnect