ফনেটিক ইউনিজয়
সমুদ্রে এলএনজি এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ
মারুফ আহমেদ

কক্সবাজারে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল ও জাহাজ নোঙরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে সরকার। এলএনজি সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নিরাপত্তার লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। কক্সবাজারে কলাতলীর পশ্চিমে গভীর সমুদ্র থেকে মহেশখালী দ্বীপ পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করে শিগগিরই এ নির্দেশনা জারি করা হবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যমান গ্যাস সংকট নিরসনে এলএনজি আমদানি শুরু করেছে সরকার। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে যৌথভাবে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করেছে। কাতার থেকে এলএনজিবাহী জাহাজ এসেও গভীর সমুদ্রে অপেক্ষমাণ। চলতি জুনে এ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান এলএনজি স্থাপনা এবং আগামী প্রকল্পগুলোর স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সন্নিহিত এলাকায় বহিরাগতদের আসা-যাওয়া বন্ধ করতে চাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, মহেশখালী দ্বীপ থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে পেট্রোবাংলার ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট- এফএসআরইউ) অবস্থান। সেখান থেকে আরও ২ দশমিক ২৯ কিলোমিটার উত্তরে সামিট পাওয়ারের এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হবে। আর পেট্রোবাংলার এলএনজি টার্মিনাল থেকে ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ও কলাতলী সৈকত থেকে ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে গভীর সমুদ্রে নোঙর করবে এলএনজিবাহী জাহাজ। এ জাহাজ নোঙর করার অবস্থান থেকে পেট্রোবাংলা ও সামিটের ভাসমান টার্মিনাল পর্যন্ত মোট ২০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে কলাতলী থেকে মহেশখালী দ্বীপ পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে গত ১৬ মে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেয় প্রকল্পটি তদারককারী সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল)। বর্তমানে এলএনজিবাহী জাহাজ, টার্মিনাল, বোর্ডিং স্টেশন, ওয়েদার বয়া ও সামুদ্রিক বয়ার অবস্থান এবং সামিটের টার্মিনালের সম্ভাব্য অবস্থান উল্লেখ করে ওই এলাকায় মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ করতে গত ২১ মে জ্বালানি বিভাগে চিঠি দেয় পেট্রোবাংলা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে চিঠি দিতে অনুরোধ করে পেট্রোবাংলা। চলতি সপ্তাহেই মৎস্য বিভাগে এ-সংক্রান্ত চিঠি দেবে জ্বালানি বিভাগ।
তবে জ্বালানি বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, এরই মধ্যে মৎস্য বিভাগ ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সাথে এলএনজি সংশ্লিষ্ট এলাকায় মৎস্যজীবী বা মাছ শিকারের নৌকার আনাগোনা বন্ধে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। ওই এলাকায় মাছ ধরার ট্রলার-নৌকার যাতায়াতও অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ বলেন, এলএনজিবাহী জাহাজ চলাচলের সময় সাগরে জাল থাকলে জাহাজ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে মৎস্য শিকারিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই ঝুঁকি ও সম্ভাব্য বিপদ এড়াতে এবং জাহাজ ও স্টেশনের নিরাপত্তায় মাছ ধরা বন্ধ রাখতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় জেলেরা জানান, মহেশখালীর ওই এলাকায় মাছের ঘনত্ব বেশি। শুঁটকি মাছের জন্যও বিখ্যাত দ্বীপ উপজেলাটি। বর্তমানে এখানে তিনটি শুঁটকিপল্লী রয়েছে। কৃষির পর মাছ ধরাই এখানকার জনগোষ্ঠীর প্রধান পেশা। উপকূলের প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাছ ধরা বন্ধ হলে স্থানীয় জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সরবরাহ কমবে শুঁটকিসহ সামুদ্রিক মাছের। এছাড়া অদূরেই বাঁশখালীতে রয়েছে ইলিশের অভয়ারণ্য। সেটিও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুর রহমান বলেন, এলএনজি স্থাপনার নিরাপত্তার সাথে ওই এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ হলেও মাছের বংশ বিস্তার বন্ধ হবে না। মাছের ঘনত্ব অন্যদিকে সরে যাবে। জেলেরা মাছ শিকারের স্থান পরিবর্তন করলে তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। বাঁশখালী-কুতুবদিয়ার ইলিশের অভয়ারণ্যটি বেশ দূরে। সেটির ওপরও প্রভাব পড়বে না।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক ৩৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংকট রয়েছে। এ সংকট ক্রমেই বাড়ছে। এদিকে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু না হওয়ায় সংকট তীব্র হচ্ছে। তাই ঘাটতি দূর করতে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয় জ্বালানি বিভাগ। এ লক্ষ্যে একটি ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণ ও ব্যবহার বিষয়ে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পেট্রোবাংলা ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মধ্যে চুক্তি হয়। এরই মধ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণ শেষ করেছে এক্সিলারেট এনার্জি। ওই টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।
এছাড়া আগামী বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি শিল্প সংস্থা সামিটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে পেট্রোবাংলার সাথে সমঝোতা স্মারক সই করেছে আরেক বেসরকারি শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকোও। এ দুই বেসরকারি টার্মিনালের প্রতিটি থেকে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

Disconnect