ফনেটিক ইউনিজয়
‘জাতীয় নদী’ ঘোষণার আহ্বান
ঝুঁকির মুখে মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননস্থল হালদা
এমডি হোসাইন

মারাত্মক দূষণের কারণে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে যাচ্ছে হালদায়। দেশের কার্প-জাতীয় মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননস্থল এ নদীতে গত কয়েকদিনে হাজার হাজার মাছ মরে ভেসে উঠছে। এসব মাছ পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে বাতাসও দূষিত হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় হালদাকে ‘জাতীয় নদী’ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম। গত ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের কাছে চিঠিও দেয়া হয়েছে। চিঠিতে চেম্বার সভাপতি বলেছেন, ‘দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে স্মরণাতীতকাল থেকে চট্টগ্রামের হালদা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। রুই, কাতলা, মৃগেল ইত্যাদি কার্প-জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক এ উৎস শত শত বছর ধরে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আমিষের জোগান দিয়ে আসছে। কয়েক হাজার মৎস্যজীবী হালদা থেকে ডিম ও পোনা সংগ্রহ করে তা বিক্রির মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে।’
বিশেষজ্ঞরা জানান, গত কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হালদা নদীতে ভাটি এলাকার কল-কারখানা, পোলট্রি খামারসহ ও বিভিন্ন শিল্পের বিপুল পরিমাণ দূষণ বিস্তারকারী পদার্থ প্রায় ২০টি খালের পানিতে বাহিত হয়ে হালদা নদীতে এসে পড়েছে। কোথাও কোথাও পানির রঙও বিবর্ণ হয়ে গেছে। হালদা নদীর পানিতে প্রতি ১ লিটারে অক্সিজেনের পরিমাণ ২ মিলিগ্রামেরও নিচে নেমে গেছে। অথচ নদীর পানিতে মাছ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন। বিশেষজ্ঞরা হালদা নদীতে দূষণ ও মাছ মরে যাওয়ার ঘটনাকে এ নদীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় বলেও আখ্যায়িত করেছেন।  
জানা যায়, হালদা নদীর মাত্রাতিরিক্ত দূষণ ঠেকাতে একটি পেপার ও বোর্ড মিল বন্ধ ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিক সাময়িক বন্ধের এ ঘোষণা দিয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নগরের অক্সিজেন মোড়ের বায়েজিদ বোস্তামী সড়কের ম্যাক পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস ১৯৯৪ সাল থেকে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। পরিবেশ ছাড়পত্র ও ইটিপি ছাড়া ?কারখানাটির অপরিশোধিত তরল বর্জ্যে হালদা দূষণের দায়ে বিভিন্ন সময় পরিবেশ অধিদপ্তর ৪৯ লাখ ৪ হাজার ২২৪ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে গত ফেব্রুয়ারির মধ্যে অন্য কোনো শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ অন্যত্র স্থানান্তর করতে না পারায় ইটিপি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি পরিদর্শনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইটিপি নির্মাণের কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। এ সময় কারখানা কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে আরও সময় চেয়েছে। কিন্তু তা অগ্রণযোগ্য ও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ বলেন, হালদা নদীকে দূষণ থেকে রক্ষার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ড. সুলতান আহমেদ বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহ্যবাহী নদী। একে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। যেসব কারণে এ নদী দূষণ হচ্ছে, সেসব বিষয় শিগগিরই সমাধান করা হবে।’ তিনি আরও জানান, এরই মধ্যে বেশকিছু বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পরিবেশ ছাড়পত্র ও ইটিপি ছাড়া কারখানা চালিয়ে হালদা নদী দূষিত করায় ম্যাক পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেডকে বন্ধ ঘোষণা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হালদার কল্যাণে শত শত কোটি টাকার মৎস্যসম্পদ উৎপাদন হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে বছরে হালদার প্রত্যক্ষ অবদান প্রায় ৮০০ কোটি ও পরোক্ষ অবদান প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় হালদার প্রাকৃতিক প্রজনন পরিবেশের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন কল-কারখানার নিষ্কাশিত বর্জ্য, বালি তোলা, নদী দখল, নালা-নর্দমার দূষিত পানির সংমিশ্রণ ও নানাবিধ মনুষ্যসৃষ্ট দূষণের কারণে হালদার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে মাছের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে মা-মাছ মরে ভেসে ওঠার দৃশ্য এখন নিত্য ঘটনা। এছাড়া হাটহাজারী সড়কসংলগ্ন একটি পেপার বোর্ড তৈরির কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য ব্যাপকভাবে হালদায় মিশেছে। সব বর্জ্য হাটহাজারীর নিম্নাঞ্চলে গিয়ে জমা হয়ে হালদায় দূষণ ঘটিয়েছে। ফলে খন্দকিয়া, কাটাখালী ও মাদারীখাল নামের হালদা সংযুক্ত তিনটি খালে বড় বড় মা-মাছসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ মরে ভেসে উঠছে।
উল্লেখ্য, এর আগে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য ও মাছের প্রজনন নিয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে একটি গবেষণাও হয়েছে। হালদা নদীর জন্য ক্ষতিকর অন্তত ১০টি কারণ চিহ্নিত করা হয় ওই গবেষণায়। এর সব ক’টি মানবসৃষ্ট কারণ। এর মধ্যে আরও রয়েছে ফটিকছড়ির চা-বাগানগুলোর জন্য নদীর পানি ব্যবহার, নদী থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উত্তোলন, মা-মাছ নিধন, খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে নদীতীরে তামাক চাষ ও যন্ত্রচালিত নৌযান থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ে দূষিত হচ্ছে হালদা নদী।
এ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন গবেষক। গবেষণায় প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের করা গবেষণাটির নাম ছিল ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অন আপস্ট্রিম ওয়াটার উইথড্রল টু কনসার্ভ ন্যাচারাল ব্রিডিং হ্যাবিটেট অব মেজর কার্পস ইন দ্য রিভার হালদা’ (উজানের পানি প্রত্যাহারে হালদা নদীতে রুই-জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের প্রভাব মূল্যায়ন)। ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গবেষণাটি চলে।

Disconnect