ফনেটিক ইউনিজয়
বড় পরিবর্তন ছাড়াই বাজেট পাস
হামিদ সরকার

বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাস হচ্ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে এবং উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখা এ বাজেটের অঙ্গীকার। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর ৫৫ ঘণ্টা আলোচনা করেন। বাজেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল ব্যবসাকে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাটের আওতায় আনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে ও কীভাবে এ ভ্যাট আরোপ হবে, তা বাজেট বক্তব্যে পরিষ্কার করে বলেননি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত ২৮ জুন অর্থবিল পাসের সময় এ বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। তবে বাড়ানো হয়নি ব্যক্তি করমুক্ত আয়ের সীমা, যেটা বাড়ানো হবে বলে সবার প্রত্যাশা ছিল।
চূড়ান্ত বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া এনবিআর-বহির্ভূত সূত্র থেকে কর রাজস্ব ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। করবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩৩ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
বাজেটে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এদিকে বাজেটে সার্বিক বাজেট ঘাটতি ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এ ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র থেকে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ২৯ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সংস্থানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেট পাসের প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যয়নির্বাহের যৌক্তিকতা তুলে ধরে মোট ৫৯টি মঞ্জুরি দাবি সংসদে উত্থাপন করেন। এ মঞ্জুরি দাবিগুলো সংসদে কণ্ঠভোটে অনুমোদন হয়। এদিকে মঞ্জুরি দাবিগুলোর মধ্যে অর্থ বিভাগে সর্বোচ্চ ২ লাখ ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯ হাজার ১৫৩ কোটি ১৯ লাখ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ২৯ হাজার ৬৬ কোটি ২১ লাখ ৭৬ হাজার, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২৪ হাজার ৮৯৬ কোটি ১৭ লাখ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ২৪ হাজার ৩৮০ কোটি ২৪ লাখ এবং বিদ্যুৎ বিভাগে ২২ হাজার ৯৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা রয়েছে। এছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে ২২ হাজার ৪৬৬ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার, জননিরাপত্তা বিভাগে ২১ হাজার ৪২৬ কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ১৮ হাজার ১৬৬ কোটি ৩১ লাখ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ১৪ হাজার ৬৩৮ কোটি ২৬ লাখ, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ১৬ হাজার ২৩ কোটি ৩৪ লাখ ৭৭ হাজার, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ১৩ হাজার ৯১৪ কোটি ৬৬ লাখ ৯৯ হাজার, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে ১৩ হাজার ৭১৭ কোটি ৬৬ লাখ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ১২ হাজার ২০০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মঞ্জুর করা হয়।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখন থেকে ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে ইন্টারনেট বা ওয়েব বা সামাজিক মাধ্যম (যেমন ফেসবুক) বা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম কিংবা এমন মাধ্যম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন, পরিবহন, যোগাযোগ (যেমন উবার, পাঠাও), ই-কমার্সভিত্তিক গাড়ি, আসবাব, এয়ারকন্ডিশনার, ফ্রিজার, রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, ওয়াশিং মেশিন, ক্যামেরা, হোম থিয়েটার, গয়না, বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাক, জুতা ইত্যাদি পণ্য বা সেবা কেনাবেচা করলে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। তবে টেলিকম অপারেটরদের প্রদত্ত যেকোনো ধরনের মোবাইল ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের ক্ষেত্রে এ ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত হবে না। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার সংজ্ঞা পরিষ্কার করেছে এনবিআর।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামনে জাতীয় নির্বাচন। তাই সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকিতে যেতে চাচ্ছে না এ বাজেট নিয়ে। এ বাজেটে যা দেয়া হয়েছে, তা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্তমান সরকার ও নির্বাচনপূর্ব সরকার বাস্তবায়ন করবে। নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক না কেন, বাজেট সংশোধন করবেই। এসআরও দিয়ে সরকার নতুন করে করারোপ করবে। এ বাজেট বাস্তবায়নে পুরো অর্থবছরেই বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, কর্মহীন প্রবৃদ্ধির তকমা থেকে বেরিয়ে আসতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নির্বাচনকালীন উত্তেজনা সামাল দিয়ে বাজেটে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

Disconnect