ফনেটিক ইউনিজয়
বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে আগ্রাসনের শিকার দেশীয় বিড়ি শিল্প
নিজস্ব প্রতিনিধি

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মিলি খাতুন। হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান মিলির সংসার ভাঙে বিয়ের দুই বছর পরই। মা-বাবার সংসারে বাড়তি বোঝা মনে হয় নিজেকে। কিছুদিন বাড়িতে বসে থাকার পর কাজ নেন নাসির বিড়ি ফ্যাক্টরিতে। এখানে প্রতি হাজার বিড়ি তৈরিতে পান ৩৬ টাকা। দিন শেষে সব মিলিয়ে আয়ের খাতায় যোগ হয় ৫০০ টাকার মতো। এভাবে মাস শেষে যা পান, তা দিয়ে মা-বাবাকে নিয়ে ভালোভাবেই দিন পার করছেন মিলি। তার মতো বিড়ি ফ্যাক্টরিতে কর্মসংস্থান হয়েছে আরও অনেক নারীর।
তামাক ও বিড়িবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও উন্নয়ন কালেক্টিভ (আরডিসি) এবং বাংলাদেশ বিড়ি শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্য বলছে, দেশে একসময় বিড়ি তৈরির ৩৫০টি কারখানা থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে ১০০-১১০-এ; যার মধ্যে সক্রিয় কারখানা আছে ৫০-৬০টি। বিড়ি কারখানা বেশি, দেশের এমন অঞ্চলগুলোর মধ্যে আছে রংপুর, কুষ্টিয়া, খাগড়াছড়ি, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা। বর্তমানে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ২১ লাখ বলা হলেও এ খাতে সক্রিয় ছয়-সাত লাখ শ্রমিক। শিল্পটি সংকুচিত হওয়ার পেছনে সিগারেট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈষম্যমূলক নীতিকেই দায়ী করছেন বিড়ি শিল্প মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু পণ্যের শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। এ তালিকায় রয়েছে সব ধরনের তামাকজাত পণ্য ও সিগারেট। এছাড়া মদ, বিয়ারে সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি ও জর্দা-গুলের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট ৪ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে আমদানি করা বহু পণ্যের দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে শুরু করেছে। এ তালিকায় আমাদানিকৃত মদ, বিয়ার, সিগারেট ও তামাকজাত পণ্যও রয়েছে। শুল্ক বাড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের কাগজে। এর মধ্যে সিগারেট পেপারও রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘বিড়ির ভয়াবহতা সিগারেটের চেয়ে বেশি। বর্তমান আর্থসামাজিক উন্নয়নের ফলে বিড়ি ব্যবহারকারী কমে যাচ্ছে। বর্তমানে এ খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যাও আগের তুলনায় কম। গত বছর আমরা ঠিক করেছিলাম, বিড়ি উৎপাদন দু-তিন বছরের মধ্যে নিঃশেষ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগেই বলেছি, এ দেশ থেকে তামাক নিঃশেষ করার সীমানা প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সাল নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিড়ি উৎপাদন ২০৩০ ও সিগারেট উৎপাদন ২০৪০ সালে নিঃশেষ করার সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। তাই এবার বিড়ির মূল্য বাড়ানো হবে না। তবে ফিল্টারযুক্ত বিড়ির ক্ষেত্রে ২০ শলাকার প্যাকেটের মূল্য ১২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা করা হবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় বিড়ি বা সিগারেটকে আলাদা করার প্রবণতা হাস্যকর। বরং দেশের বিড়ি শিল্পের ঐতিহ্য রয়েছে। কয়েক দশক ধরেই গ্রামীণ আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে বিড়ি শিল্প। স্বাধীনতার পর দেশে কৃষি বাদে মোটাদাগে তেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল না। সে সময় গ্রামীণ অর্থনীতিকে সামনে টেনে নিতে ভূমিকা রেখেছে এ শিল্প। এখন বৈষম্যমূলক নীতির কারণে অন্তত ১০-১২ লাখ বিড়ি শ্রমিকের আয়ের পথ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তটি অদূরদর্শী।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চের (সিডিইআর) নির্বাহী পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশে বিনিয়োগ জটিলতাসহ নানা কারণেই কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। প্রতিবছরই বেকারত্বের খাতায় যুক্ত হচ্ছে কয়েক লাখ তরুণ। এরপর একটি শিল্পে নিয়োজিত কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তটি হঠকারী হতে পারে; যেখানে তাদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যা ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে এখন বেকার নারী-পুরুষের সংখ্যা ২৬ লাখ। আর দেশের ৮৫ শতাংশেরই কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে।
এবারের বাজেটে দেশীয় শিল্পের বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে বেশ কিছু শিল্পে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। এর আওতায় থাকছে ওষুধ, চামড়া, টেক্সটাইল, মোটরসাইকেল, লৌহ ও ইস্পাত, গুঁড়ো দুধ প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি খাত। সরকার যেখানে দেশীয় শিল্পের প্রসারে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে, সেখানে দেশীয় শিল্প বিড়িকে বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত আবার কার স্বার্থে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বিষয়ে সরকারের দ্বিমুখী নীতি দেখা যাচ্ছে।
বৃহত্তর রংপুর তামাকচাষী ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুম ফকির বলেন, ‘ধূমপানমুক্ত করার নামে শুধু বিড়ির শুল্ক বাড়িয়ে দিয়ে সিগারেটের পক্ষে কাজ করবেন, সেটা হতে পারে না। অর্থমন্ত্রীর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি দেশের স্বার্থে না, বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষায় কাজ করছেন।’
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রাক্তন সভাপতি মনজুরুল আহসান খান বলেন, ‘মেহনতি মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলির উদ্যোগ দেশের অর্থনীতির গতিকেই রুদ্ধ করে দেবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, ‘বিকল্প ব্যবস্থা না করে বিড়ি শিল্প ধ্বংস করা যাবে না। বিড়ি-সিগারেট দুটোই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বন্ধ করতে হলে দুটিই একসঙ্গে বন্ধ করতে হবে।’
এর আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পর্যবেক্ষণে উঠে আসে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) ১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা কর ফাঁকির অভিযোগ। এর মধ্যে বিদেশি মালিকানার ৮৭ শতাংশের প্রায় ১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হয়।

Disconnect