ফনেটিক ইউনিজয়
প্রভাবশালীদের বেপরোয়া ড্রাইভিং
টাকার জোরে ‘মৃত্যু’ হয় ‘অপমৃত্যু’
জাহিদুর রহমান

একজন এমপিপুত্র পথচারীর ওপর গাড়ি তুলে দিয়ে পিষে মেরে ফেলেও বেঁচে যাচ্ছে স্রেফ ক্ষমতার জোরে। গত ১৯ জুন রাতে ঘটনা ঘটার পর প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এমপিপুত্রকে গ্রেফতার কিংবা গাড়িটি জব্দ করা হয়নি। ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঘটনাটির ‘নিষ্পত্তি’ হয়েছে বলে জানা গেছে।
কাফরুল থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ১৯ জুন রাতে রাজধানীতে ঢাকা মেট্রো ১৩-৭৬৫৫ নম্বরের প্রাইভেটকারটি সেলিম মোল্লা (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে ফ্লাইওভারের ওপর চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। চাপা দেয়ার পর গাড়িটি খুব দ্রুত বিজয় সরণির দিকে পালিয়ে যায়। গাড়িটি নোয়াখালীর একজন সংসদ সদস্যের ছেলে চালাচ্ছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে কাফরুল থানায় নিয়ে যায়। তবে গাড়িচালক ও গাড়িটি আটক রাখা হয়নি। এ ঘটনায় পুলিশ একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলা করেছে।
পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, গাড়িটির মালিক কামরুন্নাহার শিউলি। তিনি নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করীম চৌধুরীর স্ত্রী ও নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার চেয়ারম্যান। তবে ওই দুর্ঘটনার পর গাড়িটি দ্রুত এসে সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ফ্ল্যাটে যখন ঢোকে, তখন সেটিকে অনুসরণ করেন একজন মোটরসাইকেল আরোহী ও আরেকজন প্রাইভেটকার আরোহী। তারা জানিয়েছেন, গাড়িটি ওই ভবনে ঢোকার পর একজন তরুণ গাড়িটি থেকে নামেন। ভবনটির আনসার ও প্রহরীরা জানিয়েছেন, ওই তরুণের নাম শাবাব চৌধুরী। তিনি কামরুন্নাহার শিউলি ও সংসদ সদস্য একরাম চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। গাড়িটি তিনিই চালাচ্ছিলেন।
চট্টগ্রামের হালিশহর টোল রোডে বন্ধুদের নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক সোলায়মান আলম শেঠের ছেলে উমায়ের আলম শেঠ। গাড়ির ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই মারা যান ভ্যানচালক মো. মানিক। চলতি বছরের ১ মার্চ রাতের ওই ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়নি, মরদেহের ময়নাতদন্তও করেনি পুলিশ। একজন মানুষের মৃত্যু ঘটলেও পুলিশ টাকার বিনিময়ে ঘটনাটির ‘নিষ্পত্তি’ করে দিয়েছে দুই পক্ষের মধ্যে।
এর আগে ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল গভীর রাতে সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে প্রাডো গাড়ি থেকে তার পিস্তল দিয়ে চার-পাঁচটি গুলি ছোড়ে। এতে রিকশাচালক আবদুল হাকিম ও জনকণ্ঠের অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী আহত হন। হাকিম ১৫ এপ্রিল ও ইয়াকুব ২৩ এপ্রিল মারা যান।
২০১৫ সালের অক্টোবরে রাজধানীর গুলশানে কিশোর ফারিজ রহমানের বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ে তিনজন পথচারী-রিকশাচালক গুরুতর আহত হন। কিন্তু দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাবেক এমপি ডা. এইচবিএম ইকবালের ভাতিজা হওয়ার কারণে সে ঘটনায় পুলিশও এগিয়ে আসতে চায়নি। বরং ঘটনাস্থল থেকে ফারিজকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয় পুলিশ হেফাজতে এবং মামলা না করেই তাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়া হয়।
শুধু ঢাকা বা চট্টগ্রামের এসব ঘটনাই নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুর্ঘটনা, আত্মহত্যাসহ নানা ধরনের অপমৃত্যুর পর মামলা হচ্ছে না, মরদেহের ময়নাতদন্তও হচ্ছে না। তদন্ত ছাড়াই পুলিশ স্থানীয়ভাবে এসব অপমৃত্যুর ঘটনা নিষ্পত্তি করে দিচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানই বলছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে সারা দেশে ১ হাজার ৫৫৫টি অপমৃত্যুর ঘটনা পুলিশ স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি করেছে। একই পরিসংখ্যান বলছে, ওই সময়ের মধ্যে অপমৃত্যু মামলার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়ে ৬০৬টি প্রতিবেদন সংশ্নিষ্ট থানায় এসেছে। এর মধ্যে ১৮টিতে হত্যার আলামত পাওয়া গেলেও বাকি ঘটনাগুলোতে পুলিশের তদন্ত আর ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। সে কারণে বোঝা যাচ্ছে না, ঘটনাগুলো আসলেই অপমৃত্যু, নাকি হত্যা। স্থানীয়ভাবে বেশি নিষ্পত্তি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনা, নৌ-দুর্ঘটনা অথবা কলকারখানায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট শ্রমিকের মৃত্যু, ছাদ থেকে পড়ে নির্মাণ শ্রমিক বা অন্য কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু, গৃহকর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ও পারিবারিক কলহে আত্মহত্যার মতো ঘটনা। পুলিশের মাধ্যমে একটি ‘অস্বাভাবিক মৃত্যুর’ এমন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে ‘এ ঘটনায় মামলা করব না’ বা ‘ময়নাতদন্ত করতে চাই না’ কিংবা ‘আমার কোনো অভিযোগ নেই’ এমন মুচলেকা রাখা হয়। বাদীপক্ষের কাছ থেকে রাখা হয় মুচলেকা।
যদিও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দুর্ঘটনা বা অপমৃত্যুর ক্ষেত্রেই মরদেহের ময়নাতদন্ত করা, মামলা করা এবং তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আদালতকে পাশ কাটিয়ে এ ধরনের ঘটনা পুলিশ কোনোভাবেই নিষ্পত্তি করতে পারে না।
মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব কথিত নিষ্পত্তির নেপথ্যে অবৈধ অর্থের লেনদেন থাকে। সাধারণত প্রভাবশালীরা অভিযুক্ত হলে এমন মীমাংসা হয়। এতে ঘটনার শিকার ব্যক্তি আইন অনুযায়ী যেমন ক্ষতিপূরণ পান না, তেমনি দোষী ব্যক্তির বিচারও হয় না। তদন্ত না হওয়ায় নেপথ্যের ঘটনাও থাকে আড়ালে।
ফৌজদারি অপরাধ বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে অপমৃত্যুর মীমাংসা করার পুরো প্রক্রিয়াটিই ঝাপসা। আদালতকে পাশ কাটিয়ে পুলিশ এটা করতে পারে না, সে এখতিয়ারও নেই।’
উন্নয়নকর্মী ইবনুল সাইদ রানা বলেন, ‘এমপি কিংবা তার স্ত্রী যিনি নিজেও উপজেলা চেয়ারম্যান, তারা জনপ্রতিনিধি হয়েও নিরীহ মানুষকে মারার পর পুত্রকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেন। অথচ ওই নিরীহ মানুষটার প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ রকম অসংখ্য নিরীহ মানুষের হয়ে কথা বলার জন্য, তাদের স্বার্থ দেখার জন্যই জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে। অথচ তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েন একজন অপরাধীকে বাঁচাতে! আজ যদি এমপিপুত্রের বিচার না হয়, আমি বা আপনি কাল ঘরে নাও ফিরতে পারি।’
গুলশান এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ উদ্দিন বলেন, ‘গুলশানের রাস্তায় অনেকের গাড়ি চালানো দেখলেই মনে হয়, সেই গাড়ির ভেতরে যিনি, তিনিই মানুষ, আর রাস্তায় সব জন্তু-জানোয়ার! তারা যে আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে প্রতিনিয়ত এমনকি গভীর রাতে রেসিং করে, তা সবার জানা। কিন্তু তারা প্রভাবশালীর সন্তান হওয়ায় কেউই ভয়ে মুখ খোলে না।’
রাজধানীর প্রতিটি সড়কেই ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার দৃশ্য দেখা যায়। আইন ভাঙার এ দলে মন্ত্রী, এমপি, আমলা, রাজনীতিবিদ, পুলিশ কর্মকর্তা, সংবাদমাধ্যমের কর্মীসহ অনেকেই রয়েছেন। জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘যাদের আইন মানার কথা, তারাই যদি আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সাধারণ নাগরিকদের কাছে ভুল বার্তা যাবেই।’

Disconnect