ফনেটিক ইউনিজয়
আশাবাদী সরকার, বাকিরা সন্দিহান
নতুন আইনেও বন্ধ হচ্ছে না চাঁদাবাজি!
আনছার আহমেদ

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর খসড়া। আট বছর ঝুলে ছিল খসড়াটি। নতুন আইনে সড়কে আইন ভঙ্গের সাজা বেড়েছে। বেড়েছে অবহেলাজনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সাজা। নতুন আইনে সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হতাহত করলে একে হত্যা হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তার পরও আন্দোলনকারীরা বলছেন, আইনটি যথেষ্ট কঠোর নয়। সরকার আশ্বাস দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু গলদ রয়েই গেছে। চালকরা বলছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে বেপরোয়া গাড়ি চলাচল বন্ধ হবে না।
গত ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হন। চালকের ফাঁসি ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে আন্দোলনের নামে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও গাড়ির কাগজ যাচাইয়ের ‘দায়িত্ব’ নিয়ে নেয় ওই শিক্ষার্থীরা। ধরপাকড়ে পড়ে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন মালিক-শ্রমিকরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও পরিবহন খাতে অঘোষিত ধর্মঘটে গত সপ্তাহে কার্যত অচল ছিল পুরো দেশ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সংঘাত ও আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের  উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগের হামলা দেশজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যেই গত সোমবার মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায় সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর খসড়া। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়াটি সংসদে পাস হলে আইন কার্যকর হবে।
নতুন খসড়া আইন বিদ্যমান মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩ থেকে কঠোর হলেও দুর্ঘটনা কতটা কমবে, তা নিয়ে বিতর্ক ও প্রশ্ন চলছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী, বছরে দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। যা দেশের জিডিপির ২ শতাংশ। নাগরিক সমাজ ও আন্দোলনকারীরা বলছেন, নতুন আইনে এমন কিছু নেই, যাতে দুর্ঘটনা কমবেÑ চালকরা সাজার ভয়ে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাবেন, কিংবা মালিকরা নিয়ম মেনে চলবেন।
পরিবহন মালিক-শ্রমিকরাও বলছেন, নতুন অইনে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যাত্রীদের খুব বেশি লাভ হয়নি। জেল-জরিমানা বাড়ানো হলেও দুর্ঘটনার মূল কারণ দক্ষ চালকের সংকট দূর না হলে যতই আইন হোক দুর্ঘটনা কমবে না। রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও প্রশাসনের চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে সড়কে অনিয়ম বন্ধে হবে না। আইন প্রয়োগের আগে চাঁদবাজি বন্ধের দাবি তাদের।
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, আইন যত ভালোই হোক, লাভ নেই। আইনের প্রয়োগ করতে হবে। সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় অনেকগুলো ভালো দিক আছে। দুর্ঘটনায় হতাহতদের জন্য ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব ভালো দিক তখনই কাজে আসবে, যখন আইনটি মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, বেপরোয়া গাড়িতে কারও মৃত্যু ঘটলে চালকের পাঁচ বছর জেল হবে। ভোগ করতে হবে অর্থদ-ও। তবে পুলিশের তদন্তে যদি প্রমাণিত হয়, চালক উদ্দেশ্যমূলক হত্যাকা- ঘটিয়েছেন, তাহলে ৩০২ ধারায় মামলা হবে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-।
আন্দোলনকারী, পরিবহন শ্রমিক-মালিক নেতা, বিশেষজ্ঞ সবারই আপত্তি পুলিশের তদন্তে। তারা বলছেন, এতে অপরাধকে হালকা করে দেখানোর সুযোগ রয়েছে পুলিশের হাতে। আবার অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনাকেও হত্যা হিসেবে দেখিয়ে হয়রানি করানোরও সুযোগ রয়েছে। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেছেন, তদন্তকারী যে ধারাতেই অভিযোগপত্র দিক না কেন, আদালত বিচার করবেন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। নিরাপরাধ কেউ সাজা পাবেন না। অপরাধীও পার পাবে না। তবে পরিবহন নেতারা এ বক্তব্যেও সঙ্গে একমত নন। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি আবদুর রহিম বক্স দুদু সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেছেন, কোনো চালক অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ঘটালে পুলিশ হয়রানি করতে পারে। ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে অনৈতিক সুযোগ নিতে পারে।
আবদুর রহিমের প্রশ্ন, একজন চালক রাস্তায় নেমে যাত্রী পেতে প্রতিযোগিতা কেন করেন? পরিবহন শ্রমিক নেতারা জানালেন, ঢাকায় একটি লোকাল বাসকে দিনে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। বাস টার্মিনাল থেকে বের করতেই ১০০ টাকা দিতে হয় ‘গেট পাসের’ (জিপি) নামে চাঁদা। তারপর শ্রমিক ও মালিক ইউনিয়নকে চাঁদা দিতে হয়। যে কোম্পানির নামে বাস চলে, তার কর্মকর্তাদের টাকা দিতে হয়। যারা রাজনৈতিক নেতাও। দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা কোম্পানির চাঁদা। পথে পুলিশ ও প্রশাসনকে চাঁদা দিতে হয়। পুরো টাকা চালকের পকেট থেকে দিতে হয়। কারণ বাস চুক্তিতে চলে। চালকের কাছে বাস দিন চুক্তিতে ভাড়া দিয়ে মালিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা পান। সব খরচ মিটিয়ে তারপর আয় করতে হয় চালককে। তাই চালকরা বাড়তি যাত্রী তুলে আয় বাড়াতে রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালান।
ঢাকা জেলা চালক ইউনিয়নের সভাপতি হুমায়ুন কবির বলেছেন, নতুন আইনে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর সাজা বেড়েছে দুই বছরের জেল। কিন্তু চাঁদা বন্ধ করতে কোনো আইন নেই। চাঁদা বন্ধ না হলে বেপরোয়া গাড়ি চলাচল বন্ধ হবে না। নতুন আইনের খসড়ায় চালক ও হেলপারকে নিয়োগপত্র দেয়া বাধ্যতামূলক। না দিলে মালিকের তিন মাসের জেল ও ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে। এ ধারাকে শ্রমিকরা ভালো বললেও মালিকরা নাখোশ। তবে এ ধারাকে ‘চমৎকার’ বলেছেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তার অভিযোগ, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় গলদ রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালালে দুই বছরের জেল আর ভুয়া লাইসেন্সে গাড়ি চালালে দুই বছরের জেল। এর মাধ্যমে বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোকে উৎসাহিত করা হয়েছে। চালকের জেলের বিধান থাকলেও মালিকের শাস্তি বলা নেই। মালিককে লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
দেশের পরিবহন খাত চলছে ১৯৩৯ সালের ‘বেঙ্গল মোটর ভেহিকল অ্যাক্টে’। ১৯৮৩ সালে ‘মোটরযান অধ্যাদেশের’ মাধ্যমে আইনটি পরিমার্জন করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় চালক দায়ী হলে ১৪ বছর কারাবাসের বিধান ছিল অধ্যাদেশে। পরিবহন সংগঠনগুলোর আন্দোলনে তা দুই দফায় কমিয়ে তিন বছর করা হয়। ১৮৬০ সালের দ-বিধি ৩০৪ (খ) ধারায় সড়কে মৃত্যুর বিচার করা হয়। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর কারাদ-। নতুন আইনের খসড়ায় সড়কে মৃত্যুর বিচার ৩০৪ (খ) ধারায় করার বিধান রাখা হলেও সাজা দুই বছর বাড়ানো হয়েছে।
খসড়ায় বিধান রাখা হয়েছে, চালককে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে। হেলপারকে হতে হবে পঞ্চম শ্রেণি পাস। আইনের খসড়ায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। আইন ভাঙলে পয়েন্ট কাটা যাবে। কারও সব পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স বাতিল হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত বেঁধে দেয়ায় পরিবহন নেতারা বলছেন, এতে দক্ষ চালকের ঘাটতি হবে। দুর্ঘটনা আরও বাড়বে। মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, বাস্তবতা হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণি পাস চালকও পাওয়া যায় না। অষ্টম শ্রেণি পাসের শর্ত ভালো নিয়ম। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় শর্তের কারণে চালক সংকট হবে। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদের অভিমত, শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত ‘ভালো ও যুগোপযোগী’।

Disconnect