ফনেটিক ইউনিজয়
কিশোর বিদ্রোহ
শারমিনুর নাহার

গত আটদিন বাংলাদেশের মানুষ নতুন এক সময় যাপন করেছে। নতুন অনুভূতি ধারণ করেছে মনে। একে ‘নতুন বাংলাদেশ’, ‘নতুন সময়’ বলে অভিহিত করার বিকল্প নেই। একটি দুর্ঘটনা, দুটো মৃত্যু- মুহূর্তেই পরিচিত সব দৃশ্যপট পাল্টে দেয়। সহপাঠীদের মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া জানাতে স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোররা রাস্তায় নেমে আসে। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ লিখে তারা এর প্রতিবাদ জানায়। বাংলাদেশে এর আগে শিশু-কিশোরদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আন্দোলন দেখা যায়নি। ফলে নতুন এ বিদ্রোহ সবাইকে বিস্মিত করেছে, হতবাক করছে। শিশু-কিশোররা কেবল সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদ জানায়নি, তারা একই সঙ্গে রাস্তায় কীভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যান চলাচল করতে হয়, কীভাবে ইমারজেন্সি লেন ব্যবহার করা যায় ইত্যাদি কাজ বাস্তবে করে দেখিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, কীভাবে জনগণকে অনুরোধ করে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করানো যায়, চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে যাদের লাইনেন্স নেই বা মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশকে অনুরোধ করেছে। তারা বড়দের শিখিয়েছে। প্রতিদিন পথে যাতায়াতে সে যে সমস্যায় পড়ে, তা কীভাবে সমাধান করা যায়, তারা তার বাস্তব প্রয়োগ করে দেখিয়েছে। কোনো বইয়ের জ্ঞান নয়, কেবল বাস্তব সমস্যাকে প্রতিনিয়ত দেখে প্রয়োগের যে দৃষ্টান্ত তারা স্থাপন করেছে, তা দেশের ট্রাফিক পুলিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, আমাদের এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রাজপথে সাহসী কিশোরদের এ সংগ্রাম ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে আশাবাদী করেছে।
আমাদের সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে শুরু করেছে এক দশকের বেশি সময় আগে থেকে। এখন বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ জন মানুষ মারা যায়, যা কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্ব জরিপে সামনের সারিতে। সড়কে প্রাণহানি থেকে রক্ষা, প্রতিকার ইত্যাদি গবেষণা থাকলেও এর কোনো ফলাফল নেই। কারণ রাজনৈতিক। ক্ষমতা কাঠামোর সমীকরণ। কিশোর বিদ্রোহের শুরুর ঘটনাটাই তার বড় প্রমাণ। শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর বিক্ষোভে সারা ঢাকা শহর ফেটে পড়লেও নৌ-পরিবহনমন্ত্রী থাকেন নির্লিপ্ত, বরং তার উন্নাসিক হাসি মানুষের ক্ষোভকে বাড়িয়ে দিয়েছে।     
পুরো পরিবহন খাতকে নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়ার পরও তা স্বীকারে যাদের ব্যর্থতা রয়েছে, তারা আদতে কীভাবে এর প্রতিকার করবে? বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনার একটি স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট থাকলেও তাদের গবেষণা, নির্দেশনা কোনোটাই বাস্তবায়ন করা যায় না কেবল এই এক কারণে। এর আগে মেধাবী চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও দেশের প্রধান চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু তার ফলাফল শূন্য। তাই শিশু-কিশোরদের এ বিদ্রোহ আগের সব যৌক্তিকতা নতুন করে উসকে দেয়। আন্দোলন ছাড়া যে দেশে কোনো পরিস্থিতির সমাধান হয় না, তারা তা শিখে গেছে। ভবিষ্যৎ এ প্রজন্ম সর্বদাই ‘রাষ্ট্র সংস্কার’-এর কাজ করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আদতে বাসে প্রতিদিন আমরা যাদের সঙ্গে ঝগড়া, চিৎকার, রাগারাগি করে চলাফেরা করি, তারা কি সমস্যার জন্য দায়ী? একটা বড় সিন্ডিকেট, যা এখন দেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে- যারা আদতেই জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে না- পরিবহন খাত নৈরাজ্য হওয়ার পেছনে দায়ী তারা। কথাটা ছোট করে বললে, বাসের ড্রাইভার, হেলপার, কন্ডাক্টর যাদের সঙ্গে যাত্রীদের দেনা-পাওনা, তারাও তো ভাড়া খাটা শ্রমিক। বৃহৎ একটি ব্যাংক লোন নিয়ে মালিকরা বাস কেনে। পরে সেই ঋণ শোধ করার দায়িত্ব এসে পড়ে যাত্রীদের ওপর। প্রতিদিন বাসে যাতায়াতের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী- আমরা সবাই তা উপলব্ধি করি। কিন্তু এসব কি দেখার কেউ আছে? তাই কিশোরদের ওই বিদ্রোহ বাস মালিকদের বিরুদ্ধে নয়, একটা সিন্ডিকেট পুঁজির বিরুদ্ধে এ সংগ্রাম।
কিশোরদের এ বিদ্রোহ আমাদের কতগুলো নতুন বিষয় শিখিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, কীভাবে ইমারজেন্সি লেন ব্যবহার করতে হয়, ভাঙা কাচের টুকরোয় যাতে কেউ আহত না হয়, সেদিকেও তাদের নজর এড়ায়নি। সারা দেশের মানুষের সমর্থন আদায় করেছে এসব খুদে বিদ্রোহী। গণপরিবহনের মালিকরা বাস বন্ধ রাখলে স্বাভাবিকভাবে মানুষ দুর্ভোগে পড়ে, কিন্তু কেউ আন্দোলনের প্রতি বিরূপ মনোভাব দেখাননি। শিশু-কিশোরদের মা-বাবা সন্তানকে সমর্থন দিয়ে রাস্তায় এসেছেন। ফলে এক প্লেট খাবার মা তার এক সন্তান নয়, সব সন্তানকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন যেমন, তেমনি নিজে সঙ্গে করে আন্দোলনের স্পটে সন্তানকে এনে দূরে অপেক্ষা করেছেন। মায়েদের বক্তব্য, ‘কেন নিষেধ করব! ওরা যা করছে ঠিক আছে, আমরা ওদের সঙ্গে আছি।’ পরিবারের সমর্থন পেয়ে কিশোরদের সাহস আরও ব্যাপ্ত হয়েছে। আদতে নিজের সন্তানের কাছে এটাই তো তার প্রত্যাশা। যা আমি পারিনি, তা আমার সন্তান করে দেখাক।  
শিশু-কিশোরদের হাতের পোস্টারগুলোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’, ‘একটা কুঁড়ি বারুদ গন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে? সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে’। কেবল কবিতার পঙ্‌ক্তি নয়, সরকারের নানা কাজের সমালোচনাও স্লোগানগুলোতে ছিল- ‘৯ টাকায় ১ জিবি ইন্টারনেট নয়, নিরাপদ সড়ক চাই’। সব ছাপিয়ে মূল কথা হলো ‘তারা রাষ্ট্রের সংস্কার চায়’। কী দুর্দান্ত কথা। সত্যিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, আমরা সবাই কোথায়!
এ শিশু-কিশোরদের নিয়ে আমাদের ভাবনার অন্ত ছিল না। তারা ‘ফার্মের মুরগি’, ‘মোবাইল ছাড়া কিচ্ছু চেনে না’, তারা ‘আত্মকেন্দ্রিক’- কত কত কথা তাদের নিয়ে! আজ সব মিথ্যা প্রমাণ করে দেখিয়েছে তারা। কিশোর বিদ্রোহের এ উত্থানের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ আন্দোলনের মিলও অনেক। বিদ্রোহ যে মানুষের মজ্জাগত, দ্বন্দ্ব যে সর্বজনীন, সেটা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। এসব শিশু-কিশোর অনেকে মা-বাবার হাত ধরে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে গিয়েছে। স্কুল থেকেও হয়তো গিয়েছে কেউ কেউ। কিন্তু সেই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন একটা নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ ছিল। এমন সারা ঢাকা শহর জুড়ে দাবানল নয়। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই যে রাস্তায় শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে যানবাহন চলাচল, ইমারজেন্সি লেন, লাইসেন্স পরীক্ষা- এগুলো সড়কের নিরাপত্তার জন্য দরকার, সেটাইবা তারা কোত্থেকে শিখল! তাই কেবল বিদ্রোহ নয়, সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োগ করা, বাস্তবায়ন করা, এটা অবশ্যই ছোটদের আন্দোলনের একেবারে ভিন্ন দিক। যার কারণে তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জাগে, ভালোবাসা উথলে ওঠে।
এক আশাবাদী বাংলাদেশ হাতছানি দিচ্ছে। নতুনকে গ্রহণ করার প্রবণতা না রাখলে রাষ্ট্র পরিচালকরা আরও হোঁচট খাবেন। যার যা কাজ তাকে যথাযথভাবে সে দায়িত্ব পালন করতে দেয়াকেও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে না পারলে তারও যে ক্ষমা নেই, কিশোর বিদ্রোহ যেন সে কথাও মনে করিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের সংস্কারকাজ অব্যাহত থাকুক। স্যালুট তোমাদের।

Disconnect