ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ সা ক্ষা ৎ কা র
‘সচেতনতাই ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা কমাতে পারে’

ইলিয়াস কাঞ্চন। দুই যুগ ধরে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করে  আসছেন। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে আসে। এরই মাঝে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়াও অনুমোদন করেছে মন্ত্রিপরিষদ। এসব বিষয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা হয় ইলিয়াস কাঞ্চনের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান সাইদুল

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ স্লোগানে দেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, এটাকে কীভাবে দেখছেন?
আমি দুই যুগ ধরে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছি। নিরাপদ সড়ক আমরা সবাই চাই। আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা চলছে। নিরাপদ সড়কের ব্যাপারে আমি বছরের পর বছর যে কথাগুলো বলেছি, সে কথাগুলো এখন বহু কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে। তবে আমাদের এ দাবি বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ সোচ্চার নয়। আমি আশা করি, ‘নিরাপদ সড়ক’ বাস্তবায়নে সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করবে।

দুর্ঘটনা এড়াতে কী কী করুণীয়?
শুধু সচেতনতা ৮০ ভাগ দুর্ঘটনা কমাতে পারে। চালকের শারীরিক ভাষা লক্ষ করেই একজন যাত্রী বুঝতে পারবেন, চালক ক্লান্ত কিনা, সে নেশাগ্রস্ত কিনা! যেমন- চালক যদি ক্লান্ত থাকেন বা তার ঘুম পায়, তাহলে প্রথমেই তিনি ডান-বাঁয়ে ঘাড় নাড়িয়ে ঝিমুনি কাটাতে চেষ্টা করবেন। তার পরের ধাপে ঘাড়ের এক পাশে হাত দিয়ে চাপ দিতে থাকবেন। এরপর যদি চালক হাত মুঠো করে নিজের চুল টানতে থাকেন, তখন বুঝতে হবে, তিনি আর জেগে থাকতে পারছেন না। তখন সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি বা বাস রাস্তায় থামিয়ে দিতে হবে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে, চা-কফি খেয়ে অন্তত আধা ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেয়ার সুযোগ দিতে হবে চালককে। এভাবে বিশ্রামের সুযোগ পেলে চালক পরবর্তী ২-৩ ঘণ্টা সুস্থির-সজাগ থেকে গাড়ি চালিয়ে নিতে পারবেন।

অনেক শিশু আছে, যাদের পরিবহন বিশেষ করে লেগুনা চালাতে দেখা যায়, এ বিষয়ে কী বলবেন?
পরিবহন শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে অনেক শিশু। এটা আমি আগে থেকে জানি। এ খাতে শিশুশ্রম বন্ধ করার পাশাপাশি সেসব সংশ্লিষ্ট শিশু যাতে কোনো কর্মমুখী শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তার জন্যও যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শিশুদের প্রতি সবার সুনজর থাকতে হবে। বিবেক খাটিয়ে কাজ করতে হবে।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া নিয়ে আপনার অভিমত কী?
‘সড়ক পরিবহন আইন’ না করে ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’ করা উচিত ছিল। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর রাখা হয়েছে। অথচ সর্বনিম্ন শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। আইনে বলা হয়েছে, হত্যা প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সেটা হবে তদন্তসাপেক্ষে ৩০২ ধারায়। এতে সাধারণ লোকজন ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারে। সবসময় চালককে দোষী ভাবা ঠিক নয়। দায়ী মালিক হতে পারে, পথচারীও হতে পারে। তাই আইনে ‘চালক’ শব্দটির পরিবর্তে ‘দায়ী ব্যক্তি’ ব্যবহার করা যেত। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মতো সড়ক পরিবহন আইনেও জামিন অযোগ্য বিধানটি রাখা যেত। অনুমোদিত আইনে চালকদের যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি ও হেলপারদের পঞ্চম শ্রেণি পাস করার কথা বলা হয়েছে। যারা হেলপার হিসেবে কাজ করে, তাদের লক্ষ্য থাকে চালক হওয়া। তাহলে তারা পঞ্চম শ্রেণি পাস করে কীভাবে চালক হবে। এ বিষয়ে ভাবা উচিত ছিল।

শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে হামলার বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
খুবই দুঃখজনক বিষয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যৌক্তিক। তারা নিরাপদ সড়ক চায়। এখন আমি শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলন নিয়ে চিন্তিত। নোংরা রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে আছে সুযোগসন্ধানীরাও।

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায়?
চালকদের গালি দিয়ে লাভ নেই। চালকদের আপন করে নিয়ে বোঝাতে হবে। অনেক সময় চালকরা আমাকে বলে, রাস্তা ঠিক নেই কিংবা আইন ঠিক নেই। সত্যিকার অর্থে সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে। দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকই দায়ী থাকে না। এখানে মালিকরা দায়ী থাকে কোনো কোনো অংশে। যাত্রীদের প্রতিযোগিতা করে গাড়িতে ওঠা-নামাও অনেক সয় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সবাইকে সতর্ক থাকা উচিত। নিজ নিজ প্রচেষ্টায় দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব অনেকাংশে।

আপনার তো ড্রাইভিং প্রতিষ্ঠানও আছে।
অনেক শিক্ষিত ছেলেকে আমরা ট্রেনিং দিই বিনা পয়সায়। তিন মাসের ট্রেনিং। এভাবে আমরা ৫০০ শিক্ষিত চালক তৈরি করেছি। ড্রাইভিং লাইসেন্স তারা পেয়েছেন। ৫০০ পরিবার সচ্ছল হয়েছে। ভালো চালক পেয়েছি আমরা।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো কী কী?
প্রতিটি দেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কিছু আলাদা কারণ কাজ করে। সৌদি আরবে গরম আবহাওয়ার কারণে চালকদের ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া বা গরম বাতাসের চাপে চাকা ফেটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে অনভিজ্ঞতা, ট্রাফিক আইন না মানার পাশাপাশি চালকদের ক্লান্তি বা পথের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। বেশি আয়ের লোভে অনেক ক্ষেত্রে চালকেরা দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়ে গাড়ি চালান। এতে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। যাত্রীদের প্রতিযোগিতা করে ওঠা-নামা। সড়কের বেহাল দশা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

নির্বাচনে আসবেন বলে রব উঠেছে, কতটা সত্য?
এসব সত্য নয়। আমার কাছে মানুষের যেমন প্রত্যাশা, তেমনি আমিও মানুষের আশা পূরণ করার মতো যদি পরিস্থিতি কখনও পাই, তখন ভেবে দেখব। আমার নিজের জন্য কিছুর দরকার নেই, আমার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি বেঁচে থাকার জন্য দুটো খেতে পারলেই হলো। মানুষের জন্য কাজ করার সে রকম কোনো সুযোগ যদি আসে, পার্টির প্রধানরা যদি কখনও বলেন, আপনাকে এটার দায়িত্ব নিতে হবে, তখন ভেবে দেখা যেতে পারে। এ দেশের মানুষ আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে, সেটা একজন এমপি হয়ে আমি নষ্ট করতে চাই না।

Disconnect