ফনেটিক ইউনিজয়
কেমন হবে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’?
আনছার আহমেদ

আগামী ২৯ জানুয়ারি শেষ হচ্ছে বর্তমান সংসদের মেয়াদ। আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে একাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) আভাস দিয়েছে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে হবে নির্বাচন। সরকারি দলের ইঙ্গিত, আগামী মাসেই গঠিত হবে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’। সংবিধানে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ বলে কিছু না থাকলেও রাজনীতিতে জোর আলোচনা চলছে, কেমন হবে এ নির্বাচনকালীন সরকার!
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী মাসে নির্বানকালীন সরকার গঠিত হবে। ওই সরকার কেমন হবে, তা সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন, তাও প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তবে টেকনোক্র্যাট কোটায় কাউকে মন্ত্রী করা হবে না। শুধু সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সদস্যরা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবেন। মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে।
সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রী নিয়োগের এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর। ১২৩ অনুচ্ছেদের ৩(ক) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কারণে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। অন্যথায় মেয়াদ পূরণের পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।
পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হয়েছে। পূর্ববর্তী নির্বাচনে জয়ী সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান রয়েছে সংবিধানে। তবে ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনে ‘নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জামায়াতে ইসলামী বাদে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিএনপিসহ সব দলকে নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান।
কিন্তু বিএনপি ও তার জোট শরিক এলডিপি, বিজেপি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দেয়নি। বাকি দলগুলো নির্বাচলকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়। ৫৩ সদস্যের ঢাউস মন্ত্রিসভা থেকে অধিকাংশ সদস্যকে বাদ দিয়ে ২৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক জানিয়েছেন, সংবিধানে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ বলে কোনো শব্দ নেই। প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হয়েছিল গত নির্বাচনের আগে। একেই নির্বাচনকালীন সরকার বলা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করতে পারেন।
ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকার কোনো নীতিনির্ধারণী কাজ করবে না। শুধু দৈনন্দিন কাজ করবে। তবে শাহদীন মালিক বলেছেন, এ বক্তব্যও সঠিক নয়। কারণ সংবিধানে এমন কিছু নেই। ভারত, যুক্তরাজ্যসহ যেসব দেশে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেখানে সংসদের মেয়াদ পূরণের পর নির্বাচন হয়। ভারতে মেয়াদ পূরণের পর প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ ভেঙে দেন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভা পরবর্তী সরকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পদত্যাগী মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রিসভায় ১০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট (এমপি নন) মন্ত্রী রাখার সুযোগ রয়েছে। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী থাকবেন না। এমপিরাই মন্ত্রী হবেন। গত নির্বাচনের আগে গঠিত নির্বাচনকালীন সরকারে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ছিলেন না। বাদ পড়েছিলেন অধিকাংশ মন্ত্রী।
এবারও ৫৩ সদস্যের মন্ত্রিসভা থেকে অধিকাংশ বাদ পড়বেন। মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে। তিন টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীর বাদ পড়া নিশ্চিত। আর কারা বাদ পড়বেন তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে আওয়ামী লীগ সূত্রের খবর, শুধু জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা থাকবেন, বাকিরা বাদ পড়বেন। এর সঙ্গে যোগ হবেন আরও কয়েকজন।
বিএনপির দাবি, নির্দলীয় ব্যক্তিদের টেকনোক্র্যাট কোটায় নেয়া হোক নির্বাচনকালীন সরকারে। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী না রাখার সিদ্ধান্তে বিএনপির দাবি প্রকারান্তরে নাকচ করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে নাগরিক সমাজ বলছে, সংবিধানে যেহেতু বাধা নেই, তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে টেকনোক্র্যাট রাখা যেতে পারে। এম হাফিজউদ্দীন বলেছেন, মূল উদ্দেশ্য সুষ্ঠু নির্বাচন। তাই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোয় টেকনোক্র্যাট ব্যক্তিদের রাখা যেতে পারে।
জাতীয় পার্টি (জাপা) থেকে আরও কয়েকজন মন্ত্রী নেয়া হতে পারে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় জাপার তিনজন এমপি রয়েছেন। আরো তিনজন যুক্ত হতে পারেন নির্বাচনকালীন সরকারে। ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জানিয়েছেন, তার দল নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবে।
গত নির্বাচনকালীন সরকারে জাপার ছয়জন এমপি ছিলেন। এবারও জাপা থেকে ছয় থেকে সাতজন মন্ত্রী হতে পারেন। জাপার মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর নির্বাচনকালীন সরকারে মন্ত্রী হওয়া প্রায় নিশ্চিত। কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় তাদের রাখা হবে কিনা, তা একমাত্র প্রধানমন্ত্রী জানেন।
সংসদে থাকা জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির একজন করে সদস্য রয়েছে মন্ত্রিসভায়। নির্বাচনকালীন সরকারে এ দুই দল থেকে আরও একজন করে মন্ত্রী নেয়া হতে পারে। জাসদের মঈন উদ্দিন খান বাদল ও ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন।
তরিকত ফেডারেশনের দুই সদস্য রয়েছেন সংসদে। দলটির চেয়ারম্যান নজিবল বশর মাইজভা-ারীও মন্ত্রিসভায় যুক্ত হতে পারেন। জেপির এমপি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আগে থেকেই মন্ত্রিসভায় আছেন।
মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন এ ব্যাপারে প্রধানমমন্ত্রী কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন বলেও জানা গেছে। যেমনÑ আওয়ামী লীগের জ্য্যেষ্ঠ নেতা ওবায়দুল কাদের, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আমীর হোসেন আমু,  তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী ও মোহাম্মদ নাসিম নির্বাচনকালীন সরকারে যে থাকবেন, তা নিশ্চিত। গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও থাকছেন, তা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে আওয়ামী লীগের যারা মন্ত্রিসভায় নেই, তাদের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

Disconnect