ফনেটিক ইউনিজয়
মহামারী আকারে ছড়াচ্ছে ডায়াবেটিস!
হামিম কবির

ডায়াবেটিস এখন এক আতঙ্কের নাম। এ রোগ ছড়িয়ে পড়ছে মহামারী আকারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রোগটি। উন্নত বিশ^ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারলেও এশিয়া ও আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোয় এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। এসব দরিদ্র দেশে মোট স্বাস্থ্য বাজেটের বিশাল অংশ চলে যাচ্ছে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায়, বাংলাদেশ এর অন্যতম। এখন দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ রোগটিতে আক্রান্ত। আগে বলা হতো, এটা শহুরে রোগ, কিন্তু এখন গ্রামের মানুষের মধ্যেও রোগটি বাসা বেঁধেছে।
শারমিন বিনতে হক নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার শালুরদিয়া গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে। বয়স ৩০-এর বেশি নয়। কিন্তু এ বয়সেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। পরিবারের লোকজন শুরুতে ভাবতেও পারেনি, এত কম বয়সে তার ডায়াবেটিস হয়েছে। রোগটি ধরা পড়ার আগে তার শরীর শুকিয়ে যেতে থাকে, ওজন কমে যায়। শরীর থেকে শুধু ঘাম বেরোতে থাকে। শিক্ষিত পরিবারের মেয়ে বলে স্বামী ভাবলেন, হয়তো ভিটামিনের অভাব হয়েছে। উচ্চমাত্রার ভিটামিন দেয়া হলো তাকে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আয়রন, ভিটামিন এবং একই সাথে ক্যালসিয়াম খেতে দেয়া হলেও শরীরের কোনো উন্নতি না হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয় চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক থাইরয়েড টেস্টসহ রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা জানার জন্য টেস্ট দিলে দেখা গেল, শারমিনের অন্য কোথাও কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। তার রক্তে খালি পেটেই গ্লুকোজ পাওয়া গেল ১৮ মাত্রার। এত উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস দেখে পরিবারের লোকজন তাজ্জব বনে গেল!
চিকিৎসক ওষুধ দিয়ে ডায়াবেটিস কমিয়ে আনলেন। সাথে সাথে বলে দিলেন, এখন থেকে কী কী খাওয়া যাবে এবং কী কী খাওয়া যাবে না। সাথে প্রতিদিন নিয়ম করে ঘাম ঝরিয়ে হাঁটতে অথবা ব্যায়াম করতে বললেন। শারমিন সবই করছেন, কিন্তু তিনি হাঁটতে অথবা ব্যায়াম করতে অনীহা প্রকাশ করলেন। ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকায় চিকিৎসক ইনসুলিন দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিলেন। শারমিনের পিতা মোজাম্মেল হক জানান, তার মেয়ে শেষ পর্যন্ত হাঁটতে রাজি হয়েছে। সে প্রতিদিন সুঁই ফুটিয়ে ইনসুলিন নিতে চাইছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০১৭ সালের নভেম্বরে ডায়াবেটিসকে ‘বৈশ্বিক মহামারী’ হিসেবে অভিহিত করে। সংস্থাটি জানায়, বিশ্বে এ রোগে প্রতি সেকেন্ডে একজনের মৃত্যু হয়। বছরে এ রোগে ৫০ লাখ মানুষ মারা যায়। বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৩০ কোটি ৫০ লাখ মানুষের অধিকাংশই এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের দরিদ্র পরিবারের।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ড. পুনম ক্ষেত্রপাল সিং মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া ডায়াবেটিস প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মহামারী আকারে ডায়াবেটিস ছড়িয়ে পড়ছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। সতর্ক না হলে এ সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান জানান, ডায়াবেটিস হলো নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার। যে যত খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে এবং যত শারীরিক পরিশ্রম করতে পারবে, সে তত সুস্থ থাকবে। তিনি আরও বলেন, ‘খাদ্য নিয়েও ভাবতে হবে। একসময় আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। ফলে মানুষের মধ্যে রিচ ফুড খাওয়ার অভ্যাসও কম ছিল, সাথে সাথে মানুষ কায়িক পরিশ্রমও করত। এখন হাতে নগদ অর্থ আসায় তারা আর হাঁটতে চান না। সামান্য দূরত্বেও রিকশা অথবা যানবাহন ব্যবহার করেন। এ কারণে বাংলাদেশে হঠাৎ করে প্রচুর পরিমাণে ডায়াবেটিসের রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ব্যায়াম করা হলে অথবা কায়িক পরিশ্রম করা হলে শরীরে রক্ত চলাচল বেশি হয়। রক্ত চলাচল বেশি হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন রোগ-জীবাণু থেকে মানুষ সুস্থ থাকে।’
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ৭১ লাখ শনাক্তকৃত ডায়াবেটিস রোগী ছিল। এছাড়া আরও প্রায় ৭১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ে বসবাস করছিল। ওই সময় পৃথিবীতে ৪১ কোটি ৫০ লাখ শনাক্তকৃত ডায়াবেটিসের রোগী ছিল। সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ‘২০৪০ সালে পৃথিবীতে ৬৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিস নিয়ে বেঁচে থাকবে।’ ২০১৫ সালের ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশে^ ছিল দশম অবস্থানে। কিন্তু নতুন ডায়াবেটিস আক্রান্ত যোগ করে বাংলাদেশের অবস্থান হবে নবম। অন্য এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক ৯ শতাংশ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আর বাংলাদেশে প্রতি ১০ জনে একজন এ রোগে আক্রান্ত। দেশে ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়স্ক মানুষের প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
অধ্যাপক এ কে আজাদ খান বলেন, ‘ডায়াবেটিস সারা জীবনের রোগ। একবার হলে এর থেকে মুক্তির কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সারা জীবন একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন।’ ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত হাঁটা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের পাশাপাশি ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের যতেœ বিশেষ মনোযোগী হতে বলেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিসকে একতরফা বংশগত বা বয়সের কারণ হিসেবে বিবেচনা না করে বরং প্রতি মুহূর্তে সতর্কতার ওপর জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন হার্ট, কিডনি, চোখ, দাঁত, স্নায়ুতন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে। তারা জানান, শিশুদের অতিরিক্ত কম্পিউটার নির্ভরতা, শারীরিক খেলাধুলার প্রতি অনীহা, ফাস্টফুডের প্রতি ঝোঁক শিশুদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। একজন মা যখন বেশি ওজনের সন্তান গর্ভে ধারণ করেন, তখন তার ডায়বেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এ রোগের চিকিৎসায় বছরে ৮২৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশে ডায়াবেটিস যে হারে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে করে সামনের দিনগুলোতে বিশাল একটি বিপদ অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে এখন শিশু-কিশোরদের এ সম্বন্ধে সচেতন করতে পাঠ্যপুস্তকে ডায়াবেটিস-বিষয়ক একটি অধ্যায় সংযোজন করা উচিত। কারণ আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের বিভিন্ন দায়িত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হবে। বড় হয়ে তারাই বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা সুস্থ জীবনধারা সম্পর্কেও জানতে পারবে। তারা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকেও মুক্ত থাকবে।’ পরিসংখ্যান বলছে, ডায়াবেটিস হয়েছে এমন রোগীর চিকিৎসা করাতে ডায়াবেটিসমুক্ত রোগীর তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি ব্যয় করতে হয়। উচ্চ ক্যালরি ও চর্বিযুক্ত খাদ্যাভ্যাস, কায়িক পরিশ্রম না করা এবং শহরাঞ্চলে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোররাও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে।
বয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের মাত্রা বাড়ছে এটা এখন প্রায় সবাই জানেন। কিন্তু শিশুদের মধ্যেও ডায়াবেটিস আক্রান্ত পাওয়া যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারণা নেই বললেও চলে। বারডেম হাসপাতাল ২০১৬ সালে ৭০৫ জন শিশু-কিশোরের মধ্যে টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের রোগী পেয়েছে। বারডেম হাসপাতালের পেডিয়াট্রিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফওজিয়া মহসিন জানান, এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও টাইপ-১ ডায়াবেটিস পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, টাইপ-১ ডায়াবেটিস হলে দেহের স্বয়ংক্রিয় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নষ্ট করে দেয় অগ্নাশয়ে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে অচল করে দিয়ে। চিকিৎসকরা বলছেন, টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের ৫৮ শতাংশ স্থূলকায়। এসব শিশুদের ৯৪ শতাংশেরই রয়েছে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত পারিবারিক ইতিহাস। শিশুদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার পেছনে স্থূলতাকে প্রধান কারণ বলে মনে করছেন ডা. ফওজিয়া মহসিন। রাজধানী ভিত্তিক অভিজাত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করে এমন স্কুলগুলোয় পরিচালিত সমীক্ষায় জানা গেছে, এসব স্কুলের ১৭.৯ শতাংশ শিশুই স্থূলকায়, ২৩.৬ শতাংশ অতিরিক্ত ওজনের।
চিকিৎসকেরা বলছেন, শারীরিক পরিশ্রম না করা এবং ফাস্ট ফুড ও জাঙ্ক ফুড সংস্কৃতির কারণেই স্কুলের শিশু-কিশোররা স্থূ’লকায় হয়ে যাচ্ছে এবং এর সাথে তারা আক্রান্ত হচ্ছে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে। ডা. এ কে আজাদ খান বলেন, ডায়াবেটিসমুক্ত থাকার জন্য ফাস্ট ফুড, জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় পরিহার করতে হবে। এছাড়া ডায়াবেটিস মহামারী এড়ানোর জন্য শৃঙ্খলিত জীবনযাপনের বিকল্প নেই। ফাস্ট ফুড ও কোমল পানীয়র মোড়কের গায়ে চর্বির পরিমাণ ও ক্যালরি ভ্যালু উল্লেখ বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেন তিনি।

Disconnect