ফনেটিক ইউনিজয়
ভারত থেকে তেল আমদানি
নির্মিত হচ্ছে ‘ইন্দো-বাংলা মৈত্রী পাইপলাইন’
মারুফ আহমেদ

ট্রেন বা কার্গোয় নয়, এবার ভারত থেকে জ্বালানি তেল আসবে পাইপলাইনে। দীর্ঘদিন আলোচনার পর চলতি মাসেই এ প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। পাইপলাইনটি নির্মিত হলে বছরে বিপুল পরিমাণ পরিবহন খরচ ও তেলের সিস্টেম লস কমানো যাবে। ২০২০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এ পাইপলাইনের নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, বর্তমানে ক্রুড ও পরিশোধিত তেল সামুদ্রিক জাহাজ, নৌ-জাহাজ, ওয়াগন ট্রেন ও ট্যাংক লরিতে পরিবহন করা হচ্ছে। আমদানি থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত তেল সরবরাহে দীর্ঘকাল ধরে এ চার উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে তেল পরিবহনে পাইপলাইন ব্যবহার করার ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে সরকার। দেশের ভেতরে ও বাইরে দুই স্থানেই এটি করতে চায় সরকার। এজন্য আগামী তিন বছরে পাঁচটি বড় পাইপলাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। মোট ৬০০ কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্যরে এ লাইনগুলো নির্মাণে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। দেশজুড়ে সহজে তেল পরিবহন ও খরচ কমাতে এ পাইপলাইনগুলো স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে তেল আমদানির খরচ ও সিস্টেম লস কমাতে ‘ইন্দো-বাংলা মৈত্রী পাইপলাইন’ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর তেল ডিপো পর্যন্ত নির্মিত হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বর্তমানে বছরে প্রায় ছয় মিলিয়ন টন তেল আমদানি করছে। প্রতি বছরই এ চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত পাইপলাইনটি নির্মিত হলে আমদানিকৃত তেলের একটি বড় অংশ ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে আসবে।
এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান আকরাম আল হোসাইন জানান, আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়িতে পাইপলাইন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করবেন।
বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ আলোচনার পর পাইপলাইনে ডিজেল আমদানির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি (এনআরএল) থেকে এ তেল সরবরাহ করা হবে। ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের ১২৫ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে এবং বাকি পাঁচ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখ-ে স্থাপিত হবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২৯ কোটি টাকা। ভারতীয় অংশের পাইপলাইনের ব্যয় বহন করবে এনআরএল। বাংলাদেশ অংশের ব্যয় নির্বাহ করা হবে ভারতীয় ঋণ সহায়তা থেকে। পাইপলাইন নির্মাণে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ মাস।
২০১৭ সালের অক্টোবরে বিপিসি ও এনআরএলের মধ্যে পাইপলাইন নির্মাণ এবং তেল ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি হয়। ১৫ বছর মেয়াদি ওই চুক্তি অনুযায়ী, এ পাইপলাইনের বার্ষিক পরিবহন ক্ষমতা হবে ১০ লাখ টন। তবে ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম তিন বছর আড়াই লাখ টন, পরের তিন বছর তিন লাখ টন, সপ্তম থেকে দশম বছর পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টন ও ১১ থেকে ১৫তম বছর পর্যন্ত বার্ষিক চার লাখ টন ডিজেল আমদানি করা হবে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এর পরিমাণ কমানো-বাড়ানো যাবে।
বিপিসির চেয়ারম্যান আকরাম আল হোসাইন জানান, এ পাইপলাইন নির্মিত হলে দেশের উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত হবে। চট্টগ্রাম থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথে তেলের পরিবহন ব্যয় ও ক্ষতি কমবে।

দেশের ভেতরেও পাইপলাইন
দেশের ভেতরেও তেল পরিবহনে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ডিজেল আমদানিতে নির্মিত হবে ২৩৭ কিলোমিটার পাইপলাইন। নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জ থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমান ডিপোয় ১৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে লাইনে পরিবহন হবে উড়োজাহাজের জেট ফুয়েল। বঙ্গোপসাগরে নির্মিতব্য সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং থেকে তেল চট্টগ্রামের স্থলভাগে আনতে ১১০ কিলোমিটারের দুটি পাইপলাইন নির্মিত হবে।
বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, দেশজুড়ে তেল পরিবহনে বার্ষিক প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাইপলাইন নির্মিত হলে এ খরচ থাকবে না। এছাড়া তেল সরবরাহে সময়ক্ষেপণ, যানজট বা দুর্ঘটনার কারণে দেরি হওয়া বা ক্ষতি এড়ানো যাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা হরতাল-ধর্মঘটকালে নিরাপদে তেল সরবরাহ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করবে পাইপলাইনগুলো।
প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনটিতে বার্ষিক ৩০ লাখ টন ডিজেল পরিবহনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিপিসির চট্টগ্রাম টার্মিনাল থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোয় এ তেল সরবরাহ করা হবে। ২০২০ সালের মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হবে। ১৭ কিলোমিটারের জেট ফুয়েলবাহী লাইনটি ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আগামী বছরের মধ্যেই নির্মাণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এসপিএম প্রকল্পের আওতায় ওই সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং থেকে তেল স্থলভাগে আনতে ১১০ কিলোমিটারের পাইপলাইনটি বসাবে চীনের কোম্পানি চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ব্যুরো। এতে খরচ হবে প্রায় ৫ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। ২০২০ সালে এ প্রকল্প শেষ হবে। এতে প্রতি টন তেল আমদানিতে ৮ মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। এছাড়া তেল আমদানির পর তা খালাসের সময়সীমা ১১-১২ দিন থেকে কমিয়ে দু-তিনদিনে নামিয়ে আনা যাবে।

Disconnect