ফনেটিক ইউনিজয়
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
ময়লার স্তূপ নিয়েই গিনেস বুকে রেকর্ড
এম ডি হোসাইন

চিরচেনা আবর্জনার স্তূপ নিয়েই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের জন্য গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এই স্বীকৃতির খবর এখন সর্বমহলে হাস্যরসে পরিণত হয়েছে। পুরো শহরে আবর্জনার স্তূপ নিয়ে স্বীকৃতিপ্রাপ্তির উদ্যাপন অনুষ্ঠান নিয়ে খোদ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও অস্বস্তিতে ভুগছেন বলে জানা গেছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ এলাকার ড্রেনে পানিপ্রবাহ বন্ধ, ময়লা পানি আবদ্ধ হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধময় পরিবেশ। কোথাও কোথাও বাসা-বাড়ির স্যুয়ারেজ লাইনের পানি সড়কে জমছে। কোথাও বা বড় বড় ময়লার স্তূপও জমে আছে। নগরীর এসব সমস্যার কোনো সমাধান না হলেও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেয়েছে ডিএসসিসি।
গত ১৩ এপ্রিল গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে গোলাপ শাহ্ মাজার পর্যন্ত সড়কে প্রতীকী ‘ঢাকা পরিচ্ছন্নতা অভিযান’ করে ডিএসসিসি। সেখানে ঝাড়ূ হাতে ৭ হাজার ২১ জন লোক অংশগ্রহণ করে। ২৪ সেপ্টেম্বর এ খবরটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এর পরদিন নগর ভবনের সামনে ডিএসসিসি মেয়র সাঈদ খোকন সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এ স্বীকৃতিপ্রাপ্তি উদ্যাপন করেন। কিন্তু এ নিয়ে অনুষ্ঠান উদ্যাপন ও পুরো নগরীতে ব্যানার-ফেস্টুন দিয়ে মেয়রকে অভিনন্দন জানানোর ফলে বিষয়টি আরও বেশি হাস্যকর হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘নগরীর রাস্তাঘাট পরিষ্কার না করে এ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের কী দরকার ছিল? বাস্তবে কাজ না করে, এ ধরনের রেকর্ড হাস্যকর। সাধারণ মানুষও এ বিষয়ে উপহাস করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে শহরে বর্জ্যরে দুর্গন্ধ ও ধুলাবালির কারণে সড়কে চলাচল করাই দায়, কোরবানির পর বর্জ্যের দুর্গন্ধও থাকে দীর্ঘদিন, ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানে না সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাই। সেখানে গিনেস বুকে নাম হাস্যকর।’
এই স্বীকৃতির পর আবুল কালাম আজাদ নামে এক ব্যক্তি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কয়লা ধুইলে কি ময়লা যায়! যেখানে সরিষার মধ্যেই ভূত আছে, সেখানে আবার গিনেস বুক! হাস্যকর সবকিছু।’ সালাহ্উদ্দীন নামে অপর এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘গিনেস বুকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির পরিচ্ছন্নতার রেকর্ড। আমার বুঝে আসে না কেমনে কি হলো? কি পরিষ্কার করলো, আর কোন কারণে রেকর্ড করে ফললো। এটা এমন শহর যে শহরের অন্যতম প্রধান সড়ক, রাষ্ট্রপতির বাসভবনের পাশের রাস্তা দিয়ে নাকে মুখে হাত না দিয়ে হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই। রিকশা চালকরা পর্যন্ত দুর্ভোগের এ শহর নিয়ে নিয়ে যেখানে বিরক্ত, গিনেস কর্তৃপক্ষ কোন কারণে এটাকে পরিচ্ছন্ন বলছে আমার কিছুই বুঝে আসে না।’
ডিএসসিসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, স্বচ্ছ ঢাকা গড়ায় নগরবাসীকে সচেতন করতে গত ১৩ এপ্রিল প্রতীকী এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে পুরো রাজধানী পরিচ্ছন্ন না হলেও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। আর নগরীর রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই।
সম্প্রতি দক্ষিণ সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নে গঠিত কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সংস্থার প্রতিটি অঞ্চল পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বুয়েট, সেগুনবাগিচা ও শাহবাগ এলাকায় রাস্তার মধ্যে আড়াআড়িভাবে রাখা হয়েছে ময়লার কন্টেইনার। যে কারণে যানজট লেগেই থাকে। গ্রীন রোড ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, পান্থপথ ফিরোজা টাওয়ার ও মিরপুর রোডের সোবহানবাগ মসজিদের বিপরীতেও ময়লার স্তূপ জমে আছে। তাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে- রাস্তায় আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার পাশাপাশি নির্ধারিত কন্টেইনারের বাইরেও পড়ে থাকে। বিভিন্ন ড্রেনে ময়লা জমা আছে এবং ড্রেন খোলা অবস্থায় রয়েছে। খালগুলোতে প্রচুর ময়লা পড়ে রয়েছে। অনেক ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্ন পরিদর্শক ও কর্মী নেই। ফলে ওই ওয়ার্ডগুলোর প্রতিটি স্থানে ময়লার স্তূপ পড়ে আছে। এছাড়া ডিএসসিসি’র বর্জ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনে তিন শতাধিক কন্টেইনার ব্যবহার করছে। এর মধ্যে প্রায় দেড়শ’ কন্টেইনার ভাঙা। ৪০টি মেরামতযোগ্য এবং ৮২টি একেবারেই মেরামতের উপযোগী নয়।
ওই প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ডিএসসিসি’র কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এ প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সরেজমিন দেখেছি। পুরো নগরীতে কিভাবে ময়লা আবর্জনা জমে আছে। কি রকম অব্যবস্থাপনার মধ্যে চলছে। এরপরও কিভাবে এই বিশ^ স্বীকৃতি পেল, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই তা বলতে পারছেন না।’
ডিএসসিসি’র অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, ‘স্বচ্ছ নগরী গড়ে তুলতে আমাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই। এজন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গিনেস বুকের এ স্বীকৃতি সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলবে। আর আমরা মানুষকে সচেতন করার জন্যই এই কর্মসূচি পালন করেছিলাম।’

Disconnect