ফনেটিক ইউনিজয়
বিএনপি’র অবস্থান বুঝে আওয়ামী লীগের কৌশল নির্ধারণ
জয় দেব

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গুরুত্ব বেড়েছে জোটকেন্দ্রিক রাজনীতির। উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী থেকে শুরু করে জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল- সবাই নিজেদের মতো করে তৎপরতা চালাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে জোটের রাজনীতিতে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচিত জোট হচ্ছে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট ও সরকারবিরোধী শক্তি ২০ দলীয় জোট। যদিও ২০ দলের প্রধান শক্তি বিএনপি’কে ঘিরে ড. কামাল হোসেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, আ.স.ম আব্দুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো দলছুট আওয়ামী লীগ বিএনপি ও জাসদ নেতারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে। জোটগতভাবে আগামীতে আন্দোলন ও নির্বাচন করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।
গতমাসে রাজধানীর নাট্যমঞ্চে নাগরিক সমাবেশ করে কিছু দাবি ছুড়ে দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দেয়া হয় জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষ থেকে। যদিও ওই নাগরিক সমাবেশের প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল বিএনপি নেতাদের উপস্থিতি। ওই সমাবেশ থেকেই বিএনপি নেতারা প্রকাশ্যে এক মঞ্চে ওঠেন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের সঙ্গে। এর মধ্যদিয়েই জোট রাজনীতিতে নতুন করে সমীকরণ শুরু হয়ে যায়। নতুন করে নড়ে চড়ে বসে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের নেতারাও। নিজেদের শক্তির জানান দিতে ও রাজনীতির মাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই অংশ হিসেবে গত ২৯ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চের একই মঞ্চে কর্মসভা করার পাশাপাশি বড় ধরনের শোডাউন দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন করে বার্তা দেয়ার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করাসহ রাজশাহী ও খুলনায় সমাবেশ করার ঘোষণা দেন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা।  
নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়ে জাতীয় ঐক্য গঠনের ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি এতিমখানা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দি হওয়ার পূর্ব-মুহূর্তেও জাতীয় ঐক্য গঠনের কথা বলে যান। বেশকিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আলোচনা করেন তারা। এরই মধ্যে বিকল্পধারার নেতৃত্বে যুক্তফন্ট ও গণফোরাম মিলে একটি জাতীয় ঐক্য গঠনের চেষ্টা চালাতে থাকে। এ অবস্থায় বিএনপি’র সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যায় তারা। জাতীয় ঐক্য গঠনে বিরোধী শিবিরে যখন এ অবস্থা, তখন আওয়ামী লীগও জোটের পরিধি বৃদ্ধি করার মিশন নিয়ে বিভিন্ন দলের সঙ্গে নিজেদের মতো করে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যায়। বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এমন কিছু দলের পাশাপাশি ধর্মভিত্তিক কিছু দলের সঙ্গে তাদের বিভিন্নভাবে আলোচনা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ইসলামী দল ১৪ দলের সঙ্গে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বামপন্থীরা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আসবে না বলে জানিয়ে দেয়।
এদিকে ১৪ দলের শরিকরা ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে আপত্তি তোলে। পরে দলগুলোর সঙ্গে আসনভিত্তিক সমঝোতা করার সিদ্ধান্ত হয় বিরোধী শিবিরে যাওয়া ঠেকানোর জন্য। পাশাপাশি জোটের পরিধি বাড়াতে সিপিবি-বাসদের নেতৃত্বে বামপন্থী ৮ দলের যে জোট, তাদের প্রতি নতুন করে আহ্বান জানান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যদিও তারা তাদের আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন পূর্ববর্তী ও বিশেষ করে ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াতের ৯৩ দিনের অবরোধ কর্মসূচির সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবারো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পরিকল্পনা করছে।
১৪ দলীয় জোটের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী, নাটোর ও খুলনার সমাবেশের পর জোটনেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করে অক্টোবরের সুবিধামতো সময়ে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই বাকি বিভাগগুলোতেও কর্মসূচি সাজিয়ে ফেলার চিন্তা করা হয়েছে। সারা দেশে সভা-সমাবেশ করার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনবোধে তাদের সঙ্গে নিয়েই রাজপথে কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্য প্রতিক্রয়ার আসল উদ্দেশ্য যে ‘নির্বাচন করা নয়, নির্বাচন বানচাল করা’ তা জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। অতীতের মতো এবারও পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
১৪ দলের নেতারা আরও জানান, বিএনপি-জামায়াত তথা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার মধ্য দিয়েই নিজেদের নির্বাচনী প্রচারের কাজটিও সেড়ে ফেলতে চায় ১৪ দলীয় জোট। বিশেষ করে যেসব জায়গায় জোটের প্রার্থী রয়েছে সেসব জায়গায় দুইভাবেই প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যেন একসঙ্গে দুই কাজ সেরে ফেলা যায়।
এজন্য বিরোধী শিবিরের আন্দোলন মোকাবিলার পাশাপাশি নির্বাচনী, বিশেষ করে আসন সংক্রান্ত আলোচনা করতে এ মাসের মধ্যেই ১৪ দলীয় জোট নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকও সেরে ফেলতে চান জোটের নেতারা। তারা মনে করেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব কাজ করার জন্য ও আগামী দিনের রাজনীতির জন্য দ্রুত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। এটাকে বিরোধী পক্ষকে চাপে রাখার একটা কৌশল হিসেবে মনে করেন কেউ কেউ। তবে বিএনপি তথা তাদের জোট সঙ্গীদের গতিবিধি বুঝেই এসব বিষয়ে, বিশেষ করে শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনের বিষয়টি সারতে চায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি’র অবস্থান বুঝেই কৌশল নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড। ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদেরকেও এমনটাই জানানো হয়েছে বলে জোট সূত্রে জানা গেছে।

Disconnect