ফনেটিক ইউনিজয়
জাতিসংঘে আরও কিছু করার ছিল
জাকারিয়া পলাশ

জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশন শেষ হলো। সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৯০ সদস্যের বিশাল বহর সেখানে অংশ নিয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন আরো কয়েকশ’ লোক। পাশাপাশি অরাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে বেশকিছু উন্নয়ন কর্মী ও মানবাধিকার কর্মী অধিবেশনের বিভিন্ন পর্বে অংশ নেন। এ সম্মেলনের ব্যাপ্তি ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত। তবে মূল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে।
উল্লেখ্য, বার্ষিক সাধারণ অধিবেশন চলাকালে মূল অধিবেশনের পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংস্থা ও কর্মসূচির উদ্যোগে শতাধিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এসব সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। এবারের সাধারণ অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জাতিসংঘকে বিশে^র সকল মানুষের জন্য মানানসই করে তোলা এবং শান্তিপূর্ণ, সুষম ও টেকসই সমাজ প্রতিষ্ঠা। এবং এজন্য বৈশি^ক নেতৃত্ব ও অংশীদারিত্বমূলক দায়িত্ব পালন।’ এ লক্ষ্যে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন, মানবাধিকার রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জন নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয় বিভিন্ন সেশনে।
এবার জাতিসংঘে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণকে প্রধান করণীয় হিসেবে নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া বাংলা ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ‘উন্নয়নের’ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ‘সাফল্য’ তুলে ধরেন। জাতিসংঘে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ১৫তম এ ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে বলেন, ‘জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের যে চুক্তি হয়েছে, তার বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা দেখতে চাই। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে গত বছর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আমি পাঁচ-দফা প্রস্তাব পেশ করেছিলাম। আমরা আশাহত হয়েছি- কেননা আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্থায়ী ও টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে মিয়ানমার মৌখিকভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না।’
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের যে চিত্র ওঠে এসেছে, তাতে আমরা হতভম্ব। আমরা আশা করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া এ অত্যাচার ও অবিচারের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবে।’ তবে ‘গুরুত্ব সহকারে’ দেখার আহ্বান জানালেও বাংলাদেশের সরকার প্রধান অভিযুক্ত বার্মিজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মানবাধিকারের প্রশ্নে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই সর্বজনীন ভূমিকা নেয় না। একই সময় সংঘটিত বিভিন্ন মানবিক সংকটের মধ্যে কোনোটি অগ্রাধিকার দিয়ে, কোনোটি আবার অগ্রাহ্য থেকে যায় রাষ্ট্রগুলোর কাছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও অধিকার কর্মী এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে গতানুগতিক বক্তব্যের পাশাপাশি মিয়ানমারের পদক্ষেপ গ্রহণে দেরির বিষয়ে বাংলাদেশ সতর্ক করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা গ্রহণে জোরালো কোনো দাবি তোলা হয়নি। তিনশ’র বেশি লোকের লটবহর নিয়ে কী কারণে সাধারণ পরিষদে যোগ দিতে হলো- তা বোধগম্য নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর প্রধানদের সমর্থন আদায়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনের মজলুম নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পোড়ামাটি নীতি বাস্তবায়ন, জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তর বিরুদ্ধে আরও সোচ্চার হওয়ার দরকার ছিল। সৌদি আরব কর্তৃক ইয়েমেনে হামলাসহ বিভিন্ন স্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে নীরবতা কাম্য ছিল না। সামনের জাতীয় নির্বাচনে এসব রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ সমর্থনের জন্যই এ অবস্থান হতে পারে।’
অবশ্য এ সময়ে জাতিসংঘের সদর দফতর এলাকার  বিভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত অন্যান্য সেমিনারে বেসরকারি, মানবাধিকার ও উন্নয়ন কর্মীরা অংশ নিয়েছেন। উগ্রবাদ ও সহিংসতাবিরোধী একটি সেশনে অংশ নিয়েছিলেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘সরকার সাধারণত নিজস্ব বক্তব্য দিতেই জাতিসংঘে যায়। তবে এর বাইরে বিভিন্ন অধিবেশনে কমিউনিটি পর্যায়ে বিশে^র বিভিন্ন স্থানে যেসব কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয় সেগুলো আলোচনায় আসে বেসরকারি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। যেমন উগ্রবাদ ও সংহিংসতা বিভিন্ন মুসলিম দেশে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশে সেটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর জন্য সরকারের তরফে বলা হয়েছে তাদের নানা উদ্যোগের কথা। কিন্তু আমরা সেখানে আরো বলেছি যে, কীভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মাঝে সৃজনশীলতা বিকাশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কীভাবে তাদেরকে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অংশীদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মোটকথা উন্নয়নের সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।’

Disconnect