ফনেটিক ইউনিজয়
দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৩৬ লাখ
ভয়াবহভাবে বাড়ছে মাদকাসক্তির সংখ্যা
এ আর সুমন

মাদক, মরণনেশার নাম। কোথায় মিলছে না! হাত বাড়ালেই রাজধানীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও পাওয়া যাচ্ছে রকমারি মাদক। নিত্য-নতুনরূপে আসছে নতুন মোড়কে, নতুন মাদক হয়ে দেশি-বিদেশি সিন্ডিকেটের হাত ধরে। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে সারা দেশের মাদক সেবনকারীর সংখ্যাও। বর্তমানে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ৩৬ লাখে। যার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক, অর্থাৎ ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩০০। আর ৭ বছরের বেশি কিন্তু ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫৬ হাজারের কিছু বেশি। দেশে মাদকাসক্তের এ সংখ্যাকে উদ্বেগজনক বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষুনি ব্যবস্থা না নিলে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। দেশে প্রথমবারের মতো মাদকাসক্তের সংখ্যা নির্ধারণে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে আসে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ মাদকাসক্ত। অন্যদিকে, ৭ বছর থেকে ১৮ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে এই হার শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। অবশ্য প্রকাশিত সমীক্ষাটির আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ধারণা করত, দেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রমণ রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের আর্থিক সহায়তায় ২০১৭ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ সমীক্ষা চালানো হয়। দেশের সাতটি বিভাগের সাত বছরের ঊর্ধ্বে ১৯ হাজার ৬৬২ জনের ওপর বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারের প্রকোপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের ওপর সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. ফারুক আলমের নেতৃত্বে মোট পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বছরব্যাপী পরিচালিত এ সমীক্ষার তত্ত্বাবধান করেন।
সমীক্ষায় বলা হয়, দেশে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে জনগণের মধ্যে মাদক ব্যবহারের প্রকোপ ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। ভোটার সংখ্যা হিসাবে বর্তমানের বাংলাদেশে এই জনগোষ্ঠী ১০ কোটি ৪১ লাখ। সেই হিসাবে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার ৩০০। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ, ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ এবং ১৮ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ মাদক ব্যবহারের প্রকোপে রয়েছে। ১৯ হাজার ৬৬২ জনের কাছ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃত প্রশ্নমালা অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের অ্যালকোহল, স্মোকিং অ্যান্ড সাবস্ট্যান্স স্ক্রিনিং টেস্ট (এএসএসআইএসটি) করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ফারুক আলম। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে আর্থ-সামাজিক এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ৩৩টি প্রশ্নের মাধ্যমে তথ্য নেয়া হয়। এরপর এএসএসআইএসটি’র মধ্যে কোন কোন মাদক কত দিন ধরে সেবন করা হচ্ছে, সেই তথ্য নেয়া হয়। সব শেষে মানসিক রোগের উপস্থিতি আছে কি না, এর ওপর ডিএমএস ম্যাথডে ২৪টি সেলফ রিপোর্টিং প্রশ্ন করে তা নির্ণয় করা হয়েছে।’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে, বিভাগ অনুযায়ী মাদক ব্যবহারকারী সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঢাকা বিভাগে ৩৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। এ ছাড়া রংপুর বিভাগে ১৩ দশমিক ৯০, রাজশাহী বিভাগে ৭ দশমিক ১০, সিলেট বিভাগে ৬ দশমিক ৯০, খুলনা বিভাগে ৬ দশমিক ২০ এবং সবচেয়ে কম ছিল বরিশাল বিভাগে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়, মাদকের প্রকার অনুসারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গাঁজা ৮২ দশমিক ৯০ শতাংশ, অ্যালকোহল ২৭ দশমিক ৫০, ইয়াবা ১৫ দশমিক ২০, অপিয়ড ৫ দশমিক ৩০ এবং ঘুমের ওষুধ ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। পুরুষের মধ্যে মাদক ব্যবহারকারী ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নারীদের মাঝে দশমিক ৬ শতাংশ। পেশা অনুসারে মাদক ব্যবহারকারীর হার শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এটি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক অবস্থা অনুসারে বেশি আয়ের মানুষের মধ্যে মাদক সেবনকারী বেশি। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মাদক সেবনকারীর সংখ্যা এর আগে কোনো সমীক্ষায় পাওয়া যায়নি। ধারণার উপর নির্ভর করে কেউ কেউ বলতেন, দেশে মাদক সেবনকারী রয়েছে প্রায় ৭০ লাখ। এখন ৩৬ লাখ হলেও এটি আশঙ্কার বিষয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকেও মাদক সেবনকারী বা গ্রহণকারীদের সংখ্যাসহ অন্যান্য বিষয়ের সমীক্ষা চালানো হবে।’
বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে মাদকদ্রব্য প্রবেশ করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ভৌগোলিকভাবে গোল্ডেন ট্রায়্যাঙ্গেল (মিয়ানমার, লাউস ও থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান) ও গোল্ডেন ওয়েজ (নেপাল, ভুটান ও তিব্বত) এই তিন মাদক বলয়ের মাঝখানে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায়, এটি মাদক ট্রাফিকিং রুট হিসেবে পরিচিত। আর তার প্রভাবে দেশে মাদকাসক্তির সংখ্যা বেড়েছে। দেশে বর্তমানে ৩২ ধরনের মাদক সেবন চলছে। এ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন নামের যেসব মাদক উদ্ধার হয়েছে সেগুলো হচ্ছে হেরোইন, গাঁজা, চোলাই মদ, দেশি মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার, রেক্টিফায়েড স্পিরিট, কেডিন, ফেনসিডিল, তাড়ি, প্যাথেড্রিন, টিডি জেসিক, ভাং, কোডিন ট্যাবলেট, ফার্মেন্টেড, ওয়াশ (জাওয়া), বনোজেসিক ইনজেকশন, টেরাহাইড্রোবানাবিল, এক্সএলমুগের, মরফিন, ইয়াবা, আইএসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, টলুইন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, মিথাইল, ইথানল ও কিটোন। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো মরণঘাতক ইয়াবার চেয়েও নতুন মাদক দেশে ঢুকেছে সম্প্রতি। যার নাম ‘খাত’। দেখতে চা পাতার মতো, এর নাম ‘নিউ সাইকোট্রফিক সাবস্ট্যানসেস’, সংক্ষপে এনপিএস। ঢাকার মাদকাসক্তদের কাছে নাম দেয়া হয়েছে ‘খাত’ বা ‘খাট’। গ্রীন টি নামে ইথিওপিয়া থেকে বিভিন্ন চালানে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার কেজির বেশি খাতের চালান জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদিও এই খাত নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দাবি করছে, এই মাদক দেশে ব্যবহার হচ্ছে না, এটি কেবল ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নতুন এই মাদক বাংলাদেশে ব্যবহার হয় না বলে যেটি বলা হচ্ছে, সেটির সঙ্গে একমত না। এটা কখনোই হতে পারে না, এতো সুন্দর একটা আজব জিনিস এলো আর সবটাই আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হবে, নিজে কিছু খাবে না! মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে কেউ খায় না, এটা হয় নাকি! গ্রীন টি নামের একটা নতুন জিনিস দেশে এলো, যেটা খেলে নাকি শরীর মন চাঙ্গা হয়- আর বাংলাদেশের কেউ খাবে না!’ একই সঙ্গে দেশের মাদক সেবনকারীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ-পুনর্বাসনের এই নেশাদ্রব্য থেকে তরুণ সমাজকে দূরে রাখতে মাদকদ্রব্যের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ারও পরামর্শ দেন এই বিশেষজ্ঞ।

Disconnect