ফনেটিক ইউনিজয়
অনাস্থা অথবা চিকিৎসার রাজনীতি
আমীন আল রশীদ

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে যেদিন (৬ অক্টোবর) বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়, তার পরদিনই তার স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান বিএসএমএমইউ’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল হারুন। সেদিন বিকেলে চিকিৎসকদের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘চিকিৎসার চেয়ে মহৎ কোনো পেশা নেই। কারণ যখনই আমরা রোগে কষ্ট পাই, ডাক্তারের শরণাপন্ন হই।’ তিনি রোগীদের প্রতি নিবেদিত থেকে সেবা দিতে চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানান। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক কিংবা আইনের দৃষ্টিতে তিনি যত বড় অপরাধীই হোন না কেন, তিনি এখন একজন সত্তরোর্ধ নারী এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তার সুচিকিৎসার জন্য দেশের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করালেও এ ইস্যুতে বিতর্ক ও রাজনীতি পিছু ছাড়ছে না
বেগম জিয়াকে যেদিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, সেদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘হাসপাতাল যেন রাজনীতির মাঠ না হয়।’ কিন্তু রাজনীতির অভিযোগ এসেছে বিএনপি’র তরফেই। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় ৫ সদস্যের যে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে, সেখানে আওয়ামী লীগপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) দু’জন ডাক্তার রয়েছেন বলে বিএনপি নেতাদের অভিযোগ। অবশ্য সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ নাকচ করে বিএসএমএমইউ’র পরিচালক বলেছেন, মেডিকেল বোর্ডে স্বাচিপ বা ড্যাব’র (বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন) কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো সদস্য নেই।
বস্তুত বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসা নিয়ে শুরু থেকেই একধরনের রাজনীতি চলছে এবং দুঃখজনকভাবে সেটি দু’পক্ষের তরফেই। বিএনপি তার অসুস্থতার বিষয়টি অনেক বেশি সামনে এনে একদিকে যেমন আদালতের সহানুভূতি পেতে চেয়েছে তেমনি জনগণেরও। বেগম জিয়া কারাগারে অসুস্থ, সরকার তার সুচিকিৎসা দিচ্ছে না- এ কথা বলে যত সহজে নেতাকর্মীদের মনে সরকারবিরোধী অনুভূতি জাগিয়ে তোলা যায়- খালেদা জিয়া সুস্থ থাকলে সেটি কঠিন বরং তার অসুস্থতার ইস্যুটি এতো বেশি ফোকাস করা হয়েছে যে, তার অপরাধ, মামলা, বিচার, জামিন ইত্যাদি গৌণ হয়ে গেছে। সরকারও জানে যে, খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টি নিয়ে বিএনপি বেশি কথাবার্তা বললে এটি আখেরে তাদের রাজনৈতিক সুবিধা দেবে। ফলে সরকারের মন্ত্রীরা শুরু থেকেই বলছিলেন, খালেদা জিয়া অতটা অসুস্থ নন, বরং কারাগারের ভেতরেই তার পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় মূলত বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল ইস্যুতে। গুলশানে তার বাসভবনের কাছে অবস্থিত এ হাসপাতালে তিনি আগে চিকিৎসা নিতেন এবং এই হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তিনি ছিলেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার আইনজীবী ও দলের পক্ষ থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে তার চিকিৎসার দাবি জানানো হয়। কিন্তু সরকার বারবারই বলে আসছে যে, কোনো বেসরকারি হাসপাতালে তার চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্টও। সরকারের দাবি, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসায় তারা আন্তরিক। বিএসএমএমইউ’তে রাজি না হলে তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তিরও প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু বেগম জিয়া ইউনাইটেডে চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে অনড় থাকেন।
বিষয়টি নিয়ে অবশেষে উচ্চ আদালতকেই সিদ্ধান্ত দিতে হয়। আদালতের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বেগম জিয়াকে বিএসএমএমইউ’তে ভর্তি করা হয় এবং এ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেযারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরীর নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন- ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেসা আহমেদ, রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সজল ব্যানার্জী এবং অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক চেযারম্যান অধ্যাপক ডা. নকুল কুমার দত্ত। মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মামুন রহমানও রয়েছেন। বিএনপি’র অভিযোগ, পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডে দু’জন সরকারপন্থী সংগঠন স্বাচিপের সঙ্গে যুক্ত।
যেহেতু অন্যান্য পেশার মতো চিকিৎসকরাও রাজনৈতিক দলে বিভক্ত এবং বেগম জিয়া একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব- সুতরাং মেডিকেল বোর্ড গঠনে সরকারের আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত ছিল, যাতে এ নিয়ে বিএনপি কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ না পায়। বেগম জিয়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তার ও তার দলের বিপুল জনসমর্থনও রয়েছে। সে কারণে যে মামলায় এবং যে অভিযোগে তার সাজা দেয়া হয়েছে, সেটিকে সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে বিশ্বাস করা লোকের সংখ্যাও কম নয় ফলে খালেদা জিয়ার অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, যেহেতু তিনি কারাবন্দি এবং যেহেতু তিনি অনেকদিন ধরেই জটিল আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত- ফলে তার প্রতি বিএনপি তো বটেই, নির্দলীয় লোকের একাংশেরও সহানুভূতি রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে কেন এই রাজনৈতিক বিতর্ক উঠছে? উত্তর সহজ। সেটি হলো আস্থা ও বিশ্বাসের সংকট। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আস্থাহীনতা- তা থেকে চিকিৎসাও মুক্ত নয়। নয় বলেই বিএনপি বা খালেদা জিয়ার সন্দেহ- তার পছন্দের হাসপাতাল ও ডাক্তার ছাড়া তার সুচিকিৎসা হবে কি-না যে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতির কারণে ১৯৯৬ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হয়নি তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগই আবার দেড় দশক পরে সংবিধান থেকে সেই ব্যবস্থা তুলে দেয়। এখন সেই বিএনপিও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি নয়। এ কারণে তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে। অর্থাৎ বিরোধী দলে থাকলে আমাদের দলগুলো যে ব্যবস্থা পছন্দ করে, সরকারে গেলে সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

Disconnect