ফনেটিক ইউনিজয়
সরকার নিজেই নিজেকে গণশত্রুর কাতারে নিয়ে যাচ্ছে : আনু মুহাম্মদ
রিয়াজ হোসেন

তেল গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য শুধু  বিশাল সম্পদই নয়, এটা বাংলাদেশের অস্তিত্ব। অথচ উপকূল জুড়ে সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক। তিনি আরও বলেন, ‘দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে। সুন্দরবন না থাকলে দেশের কয়েক কোটি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। অথচ সরকার জনমতকে উপেক্ষা করে এখনও এসব প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা গত সাত বছর ধরে এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। বর্তমানে আন্দোলনে কিছুটা ভাটা পড়লেও প্রবল একটা জনমত তৈরি হয়েছে। সরকার এটাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে নিজেই নিজেকে গণশত্রুর কাতারে নিয়ে যাচ্ছে।’
সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান, সরকার সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি আরো ৩০০টি ছোট বড় প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে, যা সুন্দরবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনই লক্ষ্য হয়, তবে কম পয়সায় পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকারের কাছে জাতীয় কমিটির বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা করেছি, সরকারকে তার ব্যখ্যা দিয়েছি। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী আন্দোলন করতে গেলে যে পরিমাণ শক্তি দরকার, তা আমরা অর্গানাইজ করতে পারিনি। ওই অঞ্চলে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থান দুর্বল। তাছাড়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যারা এ প্রকল্পের ক্ষতিকর পরিণত সম্পর্কে অবগত, তাদের বড় একটি অংশই প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত। এর ফলে বড় আকারের আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আমাদের অবস্থান আমরা জানিয়েছি। বিকল্প জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনায় আমরা উল্লেখ করেছি যে, আমাদের রূপপুরও দরকার নেই রামপালও দরকার নেই। আমরা কম টাকায় ২৪ ঘণ্টা সকলের জন্য কিভাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়, তা ওই পরিকল্পনায় উল্লেখ করেছি।’
বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠন হওয়ায় আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি থাকে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর এই তৎপরতা স্বাভাবিক। তবে আমি আশা করব, এ নির্বাচন পক্রিয়ার মধ্যে বাম গণতান্ত্রিক জোট সুন্দরবন, রূপপুরসহ সরকারের জনবিধ্বংসী প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকবে। সেটা যদি তারা করে, তাহলে এ আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে।’
কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে বরেণ্য এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘তরুণরা একটা হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে রয়েছে। তারা পরীক্ষায় পাস করছে, অথচ তাদের কোথাও কর্মসংস্থান হচ্ছে না। যেকোনো জায়গায় চাকরির জন্য গেলে লাখ লাখ টাকা লাগে। বিসিএস পরীক্ষা দিতে এসে দেখে সেখানেও কোটা। ফলে অসহায়ত্ব থেকে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সরকার যে মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোবেসে কোটা সংরক্ষণ করছে, বিষয়টা এমন নয়। নিয়োগ বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার কোটা সংরক্ষণ করতে চায়।’
এ সময় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা এখনও সম্পন্ন হয়নি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে ৩০ শতাংশ কোটা রাখা হলো। আসলে সরকার তাদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে। এ কোটা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভালোবাসা নয়, এটা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমান।’  
সরকারের রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচারণা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, বিদ্যুতের সে রকম যোগান দেখতে পাচ্ছি না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। এসব প্রকল্প নিয়ে যেন  কোনো প্রশ্ন উঠতে না পারে সেজন্য দায়মুক্তি আইন করেছে সরকার। দায়মুক্তি আইন বহাল থাকায় এসব প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।’
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বিভিন্ন সময় সরকারের গৃহীত প্রকল্প সম্পর্কে আমরা পরামর্শ দিয়েছি । কিন্তু সরকার আমাদের কথায় কর্ণপাত না করে একের পর এক দেশবিরোধী প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই যাচ্ছে। সেজন্য দুই বছর গবেষণা করে আমরা গত বছর একটি বিকল্প মহা-পরিকল্পনার খসড়া উপস্থিত করেছি। সেটা আমরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠিয়েছি। এ বিকল্প মহাপরিকল্পনা দেখলে মনে হবে সরকার যেসব প্রকল্প নিয়েছে সেসব পরিকল্পনা অযৌক্তিক। এই মহাপরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থিত করাই হচ্ছে আমাদের প্রধান কাজ।’ বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিকরা এ বিকল্প প্রস্তাবনাটা মানুষের সামনে উপস্থিত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Disconnect