ফনেটিক ইউনিজয়
সংসদ নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের ভাবনা
সেলিম আহমেদ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে অথবা জানুয়ারি মাসের শুরুতেই নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এখনো চূড়ান্ত হয়নি নির্বাচনের দিনক্ষণ। নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মাঝে দেখা দিয়েছে নানা কৌতূহল। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক-শ্রমিক আর খেটে খাওয়ার মানুষের মাঝে এখন দু’টিই প্রশ্ন- ‘এবার কি হবে নৌকা আর ধানের শীষের নির্বাচন?’, ‘আর কতদিন দেশে হবে ভোট নিয়ে মারামারি?’। ভোরবেলা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গ্রামের চায়ের দোকান থেকে অফিসপাড়া সব জায়গায়ই চলে নির্বাচন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তর্ক-বির্তক আর যুক্তি-গল্পও হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। আলোচনায় উঠে আসে দেশের চলমান রাজনীতি, গণতন্ত্র, ভোট ও উন্নয়ন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শহরের মানুষের মতো গ্রামের মানুষেরও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। নির্বাচন হবে কি-না, বিএনপি ও তার শরিক দল এবং ১৪ দলীয় জোটের বাইরে থাকা দলগুলো নির্বাচনে যাবে কি-না, ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো আবারো দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় কি না- ঘুরেফিরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে এমন প্রশ্ন, শঙ্কা ও সংশয়।
দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা হয় এ উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নির্বাচন নিয়ে তাদের আশা, আকাক্সক্ষা, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার কথা।
উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে অবস্থিত রাঙ্গীছড়া চা বাগান। বাগানের চা শ্রমিক উত্তম কুমার, আলোক নাইডু, সৌরজিৎ নাইডু বলেন, ‘বাবুজি আর কতদিন ভোট লইয়া মারামারি হইব? দেশে কি নৌকা আর ধানছড়ার ভোট আইব না। বাবুজি ভোট না আইলে বুঝি দেশে শান্তি আইব না!’  
এ উপজেলায় রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক আদিবাসীপল্লী। এসব পল্লীর মানুষ নির্ভরশীল জুমে পান চাষের ওপর। পান বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে তাদের জীবন-জীবিকা। সেগুলঠিলা পান পুঞ্জির এমিল রয় লায়ং, নার্সারি পানপুঞ্জির প্রধান পায়লা পঠাং, রাসেল পঠাং জানান, পান চাষ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে আমাদের জীবন। নির্বাচনের সময় হরতাল অবরোধ হলে বাজারে পাইকাররা পান কিনতে আসেন না। ফলে পান ভালো দামে বিক্রি হয় না এবং ওইসময় আমাদের দারুণ কষ্টে দিনপাত করতে হয়।
কুলাউড়া-মৌলভীবাজার সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুকুমার কর, বাদশা মিয়া, আসলাম মিয়া জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। কারণ হিসেবে জানালেন সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে দেশে মারামারি হয়। হরতাল-ধর্মঘট হয়। গাড়ি ভাঙচুর, এমনকি পুড়িয়েও দেয় বিক্ষোভকারীরা। ফলে গাড়ি নিয়ে বাইরে বের হওয়া যায় না। আয়-রোজগার কমে যায়। ভয়ভীতি বাড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকায় তখন সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে ওঠে।
কুলাউড়া পৌর শহরের মিলি প্লাজার ব্যবসায়ী হুমায়ুন রশীদ রাজন, সুহেল আহমদ, আব্দুল আহাদ, সুমেল মাহবুব, সুলতান আহমদ, কুলাউড়ার মুদি দোকানি রাজন বাউরি, আলাল মিয়া, সবজি দোকানি দিলু মিয়া জানান, প্রবাসী অধ্যুষিত এই জেলার প্রবাসীরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশে আসতে চান না। এমনকি টাকা-পয়সাও পাঠান না। তারা দেশে না আসায় ও টাকা-পয়সা না পাঠানোয় ব্যবসা-বাণিজ্যের চরম ক্ষতি হয়। ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক সচেতন মহলের লোকজন জানান, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় হামলা-মামলায় জড়িয়ে একভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। অপরদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের নেতারা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লুটপাট নিয়ে জড়িয়ে পড়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ হানাহানির ঘটনা ঘটে প্রায়ই।
ব্যবসায়ী, শিক্ষকসহ নানা শ্রেণি-পেশার খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা নানা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার কথা জানান। তারা বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন উৎসবের কারণ হলেও আমাদের দেশে উল্টো চিত্র। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে নির্বাচন ও ভোট নিয়ে চলমান এ সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তাই ভোটের খবর এলেই যেন অজানা শঙ্কা ভর করে।
তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা স্মরণ করে বলেন, সে সময় দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছিল প্রতিটি খাতে। হরতাল-অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা, হামলা-মামলা আর পুলিশি ধরপাকড়ে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সারা দেশের মতো মৌলভীবাজারের শিল্পগুলোতেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। চা-পাতা ও রাবার সময়মতো ঢাকা ও চট্টগ্রামে না পাঠাতে পারায় অধিকাংশ বাগানের কাঁচামাল নষ্ট হয়েছে। সে সময় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন মালিকেরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চা-বাগান ম্যানেজার বললেন, ‘নির্বাচন না হলে যে দেশে শান্তি আসবে না আর চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাও কমবে না, এটা বুঝতে পেরেই চা-শ্রমিকেরা নির্বাচনের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কারণ ২০১৪ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হরতাল-অবরোধের কারণেই তাদের আদি পেশার এই শিল্প প্রতিদিনই ক্ষতির শিকার হয়েছিল।’ তিনি আরও জানান, বাগান এলাকাসহ গ্রামের কৃষিজীবী লোকজন সব সময়ই শান্তিপ্রিয়। নির্বাচন নিয়ে হানাহানি কেউই পছন্দ করে না।
কুলাউড়ার মতো দেশের প্রতিটি গ্রামের হাট-বাজারে নির্বাচনী উৎসব কিংবা আমেজের চাইতে ভয়ভীতির কথাগুলোই আলোচনা হচ্ছে বেশি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনে দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীরাও প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। চোখে পড়ার মতো স্থানে দলীয় প্রধান, নিজেদের ছবি ও দলীয় প্রতীক সংবলিত ব্যানার-ফেস্টুন টানাচ্ছেন। তবে নির্বাচন নিয়ে সে রকম সরব হচ্ছেন না অজানা শঙ্কায়।

Disconnect