ফনেটিক ইউনিজয়
কোটার রাজনীতি
আমীন আল রশীদ

দাবি ছিল কোটা সংস্কারের। কিন্তু করা হলো বাতিল। সঙ্গত কারণেই কোটা পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী মানুষেরা।
মনে রাখা দরকার, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের শুরু থেকেই এটিকে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকারবিরোধী তৎপরতা হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলেছে। খোদ জাতীয় সংসদেও একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দিয়েছেন। এই আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের এজেন্টরা ইন্ধন দিচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব অভিযাগের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বলা হয়, একটি জনদাবির আন্দোলন নস্যাৎ করতেই এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
এরইমধ্যে কোটা সংস্কারের জন্য গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ আসে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার। অর্থাৎ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জনদাবিতে গড়ে ওঠা অরাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে শুরু থেকেই রাজনীতি চলছে- যা এখন আরও বড় সংকট তৈরি করল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা- এমন অদ্ভুত ব্যবস্থা নিশ্চয়ই পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। কিন্তু তারপরও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, নারী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী এবং বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে থাকা জেলার চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি যৌক্তিক সংখ্যায় কোটার     প্রয়োজন ছিল এবং এখনও আছে। যারা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এবং সমাজের সচেতন মহলও বলেছেন যে, কোটা অবশ্যই থাকবে, থাকতে হবে- কিন্তু সেটি নিশ্চয়ই ৫৬ শতাংশ নয়। মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, নারী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী এবং পিছিয়ে থাকা জেলার জন্য সব মিলিয়ে ২০ শতাংশ কোটা রাখা হলেই বরং সব পক্ষ খুশি হতো এবং পরিপত্র জারির পরে কোটা পুনর্বহালের দাবিতে কয়েকটি পক্ষকে রাস্তায় নামতে হতো না। কিন্তু কোটা পুরোপুরি তুলে দিয়ে বস্তুত এ ইস্যুতে সৃষ্ট সংকট আরও ঘণীভূত করা হয়েছে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারাও বলেছেন, তারা কোটা বাতিল চাননি, বরং সংস্কার চেয়েছিলেন। সেইসাথে কোটায় প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা তালিকা থেকে পূরণের দাবিও জানিয়েছিল তারা। সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা ছিল, ৫৬ শতাংশ কোটা সংস্কার করে নিশ্চয়ই এটিকে অর্ধেকে বা একটি যুক্তিপূর্ণ সংখ্যায় নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু কোটা পর্যালোচনা কমিটি কোটা প্রায় পুরোটাই তুলে দিয়ে মেধাকে প্রাধান্য দেয়ার সুপারিশ করে। প্রশ্ন হলো, তারা কি জানতেন না যে কোটা পুরোপুরি উঠিয়ে দিলে এরও তীব্র প্রতিক্রিয়া হবে?
সরকার বলেছে, তারা বৈষম্য কমানোর জন্য কোটা তুলে দিয়েছে। কিন্তু আদতে এতে বৈষম্য বেড়েছে। কেননা সংবিধানে (২৮ অনুচ্ছেদ)  বলা হয়েছে- ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না’। অর্থাৎ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ বিধান করতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোটা পদ্ধতি রয়েছে। ভারতেও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কোটা রয়েছে। মালয়েশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূমিপুত্রদের জন্য কোটা রয়েছে। যুক্তরাজ্য হাউস অব লর্ডসে ঐতিহ্য রক্ষার নামে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটাপ্রথা চালু আছে।
তবে আমাদের সমস্যাটা কোটা থাকা না থাকার চেয়ে আরও গভীরে। তা হলো- পরীক্ষা পদ্ধতি এবং চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি ও দলীয় বিবেচনা। হাজার হাজার তথ্য মুখস্থ করে এমসিকিউ পদ্ধতিতে নম্বর পাওয়া মেধার স্বাক্ষর কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য বাজারে যেসব বইপত্র পাওয়া যায়, সেগুলো বস্তুত গাইড বই। এসব গাইড বই মুখস্থ করে অনেক কম মেধাবীরাও নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে। অনেক সময় প্রকৃত মেধাবীরা বাদ পড়েন। ফলে কোন প্রক্রিয়ায় মেধা যাচাই করা হবে- সেটিরও একটি মানদণ্ড থাকা দরকার। অর্থাৎ চাকরির পরীক্ষা পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।
চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরেও যে সবাই শুধু মেধার ভিত্তিতে চাকরি পেয়ে যান, এমন নয়। বরং মোটা অংকের ঘুষ, উচ্চ পর্যায়ের তদবির এবং রাজনৈতিক বিবেচনা এখন চাকরি পাওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। বিসিএসসহ অন্য সব ধরনের সরকারি চাকরিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের তরফে তালিকা দেয়া হয়- এটি এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়।
সুতরাং কোটা নিয়ে রাজনীতির অবসান হওয়া যেমন জরুরি, তারচেয়ে বেশি জরুরি সরকারি চাকরিতে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করা। সেটি কে করবে? যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারা তাদের লোকদের চাকরি পাওয়া নিশ্চিত করবে, এটিই এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। সুতরাং কোটা থাকলেই যে সব সময় ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে- এমনটাও নয়।

Disconnect