ফনেটিক ইউনিজয়
আশা-নিরাশার সংলাপ ও সংবিধানসম্মত বিকল্প
কামাল উদ্দীন

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে বড় ধরনের বাঁক খেয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবির মুখে হঠাৎ করেই সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে চলছে রাজনৈতিক টানাপড়েন। মুখ দেখাদেখিও ছিল না সরকার ও বিরোধীপক্ষের নেতাদের। এক দশক ধরে বিরোধীরা সরকারি দলের মুখোমুখি হয়েছে কেবল ভিকটিম হিসেবে। এখন নির্বাচন সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও জটিল। কেউ আশাও করেনি, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদের সংলাপের দৃশ্য দেখবে বাংলাদেশের মানুষ! তারা টেবিলে মুখোমুখি বসতে পারবে বা চোখে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে, এটা মিডিয়া বা সাধারণ মানুষের চোখেও ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু সেটাই ঘটল। সরকারের একদম শেষপর্যায়ে এসে অনুষ্ঠিত হলো বহুল প্রত্যাশিত সেই রাজনৈতিক সংলাপ। তবে আকস্মিক এ সংলাপ কতদূর, কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?
প্রথম দফা সংলাপে সার্বিক পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি। সরকার পক্ষ অনড়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সন্তুষ্ট নয়। তারপরও উদ্যোগটিকে জনগণের প্রাথমিক বিজয় মনে করছেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা বলছেন, সংলাপ ‘হবে না’ থেকে ‘হয়েছে’। দ্বিতীয় দফায়ও হবে। এর মাধ্যমে গলতে শুরু করেছে দীর্ঘদিনের বরফ। স্রোত হয়ে মোহনার দিকে এগিয়ে যাওয়াই সে বরফগলা পানির স্বভাব। প্রকৃতির এ চিরন্তন নীতিকে আশার সূক্ষ্ম আলোর রেখা হিসেবে বিবেচনা করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ প্রথম দফা সংলাপ শেষে ছোট পরিসরের দ্বিতীয় সংলাপে রাজি হয়ে দিনক্ষণও চূড়ান্ত করেছে সরকার। এটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন সবাই। সরকার যদি ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে সংলাপে অংশ নেয়, তাহলে দ্বিতীয় দফা আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে এমন আশাবাদ সবার। সেদিন দৃশ্যমান কিছু অর্জনের লক্ষণ স্পষ্ট হতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তরফে তৈরি করা হয়েছে নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অব্যাহতভাবে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছেন। সংলাপের ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চিঠির জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার আমন্ত্রণপত্রে লিখেছেন- অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সংবিধানসম্মত সব বিষয় আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত।’ অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বপদে রেখে ও বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে ঘোরতর আপত্তি রয়েছে বিরোধী নেতাদের। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধানের বিধি-উপবিধি ঘেঁটে বের করা হয়েছে বিকল্পপথ। ফ্রন্টের নেতারা বিশ্বাস করতে চান, এখন নিশ্চয় সংবিধান থেকে বিকল্প উপায়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। অবশ্যই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ‘৮ তারিখে’ সবকিছু পরিষ্কার হবে জানিয়ে সংলাপকে ঝুলিয়ে দিয়েছেন আশার সূক্ষ্ম সুতোয়। 
দেশের সাধারণ মানুষ এই বহুল প্রত্যাশিত সংলাপের সাফল্য কামনা করেছিল এবং এখনো সংলাপকে অব্যাহত রেখে এর যৌক্তিক পরিণতি কামনা করে। সাধারণ মানুষসহ রাজনীতিক মহল তো বটেই, দেশের ব্যবসায়ীরাও চায় এ সংলাপের সফল সমাপ্তি। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, আকস্মিক সংলাপ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোথায় নিয়ে যাবে? জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের তরফে ইতিমধ্যে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, সংলাপকে গুরুত্বহীন করে ফেলেছে সরকার। শঙ্কাটি অমুলক নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিপরীতে খ-িতজোট যুক্তফ্রন্ট যখন সরকারের অনুকূলে পাল তুলে দেয়, তখন সে সংলাপের গন্তব্য নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এছাড়া সরকার ধারাবাহিকভাবে ২ নভেম্বর যুক্তফ্রন্ট, ৪ নভেম্বর ১৪ দল ও ৫ নভেম্বর এরশাদের জাতীয় পার্টি, ৬ নভেম্বর বাম গণতান্ত্রিক জোটের সঙ্গে সংলাপ হয়। এখন বুধবার দ্বিতীয় দফা সংলাপ থেকে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতির লক্ষণরেখা দেখা না গেলে সমঝোতার যাবতীয় পথই হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। তখন রাজনীতির গতি-প্রকৃতি কোন দিকে যায়, দেশবাসীকে সেটি দেখার অপেক্ষায়ই থাকতে হবে।
 
সংলাপের অর্জন ও বৈশিষ্ট্য

সংলাপ থেকে দু’টি ক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে ‘প্রাথমিক আংশিক অর্জন’ দেখছে রাজনৈতিক মহল। গায়েবি মামলা ও গ্রেপ্তার বন্ধ এবং সভা-সমাবেশের অধিকারে বাধা না দিতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি। অবশ্যই সংলাপের পরও মামলা এবং গ্রেপ্তার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। কিছুই ছাড় না দিয়ে সংলাপ যদি ‘অর্জন’ হয়, তাহলে সেটা কৌশলগত অর্জন। এই সংলাপের অন্তত ৫টি দিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এক. সংলাপটি হয়েছে রাজপথের আন্দোলন বা কূটনীতিকদের দৃশ্যমান কোনোরূপ দৌড়ঝাঁপ বা দূতিয়ালি ছাড়া। দুই. বৈঠক ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার একটি ভালো উদাহরণ তৈরি করেছে দুইপক্ষই। পরস্পরকে থামিয়ে দেয়া, কথার মধ্যে কথা শুরু কিংবা বাধা দেয়ার চেষ্টার একটি ঘটনাও ঘটেনি। এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের ইঙ্গিতবহ। তিন. সাধারণত সরকারের উদ্যোগেই রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। চার. বিরোধী দলের প্রতি যুদ্ধংদেহী মনোভাব নয়, গণভবনের সংলাপে নেতাদের বাক্সংযম ও পরিমিতিবোধ ছিল লক্ষণীয়। পাঁচ. সংলাপ শুরুর প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করা যে অসম্ভব নয়, তৈরি হয়েছে তার নজির। সংলাপের আরেকটি বড় অর্জন হচ্ছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে দ্বিতীয় দফা ছোট পরিসরে সংলাপের ব্যাপারে সরকারের সায়। ড. কামাল হোসেন ‘ভালো আলোচনা’ ও বিএনপি’র মহাসচিবের কথায় ‘সন্তুষ্ট নই’ মন্তব্য দু’টির মধ্যে দৃশ্যমান ফারাক থাকলেও একই সঙ্গে রয়েছে সূক্ষ্ম সম্পর্কের সুতো। অন্তরঙ্গ পরিবেশ বিবেচনায় যেমন ড. কামাল ভালো বলেছেন, তেমনি সরকার সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দাবি না মানায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মির্জা আলমগীর। তবে পাল্টাপাল্টি কথা না বলার এই মনোভাব বজায় রেখেছে দুই বড় দল প্রশংসনীয়ভাবে। দুইপক্ষই আগ্রহ ব্যক্ত করেছে পুনরায় সংলাপে বসার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সাড়ে তিন ঘণ্টার সংলাপে আপাত দৃষ্টিতে কোনো ফল আসেনি। দুই পক্ষই এখনো দুই মেরুতে আছে। তবে আলোচনা পণ্ড হয়নি এটাই অর্জন। এটাই সবচেয়ে বড় আশার কথা।’ সবশেষ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর যোগদান নতুন করে শক্তি যোগাচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের। 
 
দ্বিতীয় সংলাপ ও ‘সংবিধানসম্মত’ রূপরেখা

সংবিধানে থেকেই নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বিদ্যমান সংবিধানের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের অনড় অবস্থানের কারণে সংবিধানের ধারা-উপধারা বিশ্লেষণ করে রূপরেখাটি তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনাকে ছ–টিতে রেখে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করার সুযোগ তৈরি হলে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারেও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সংলাপের টেবিলে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব দেবেন। একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংবিধান কোনোভাবেই বাধা নয়। বরং প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছাই এখানে মুখ্য। তবে বৃহত্তর স্বার্থে কিছু বিষয়ে ছাড় দিতেও কার্পণ্য করবে না ফ্রন্ট। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের দাবিকৃত, ‘সংবিধানসম্মত’ উপায়েই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি মানা সম্ভব। ‘সংবিধানসম্মত’ এই রূপরেখায় সাত দফার ভিত্তিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করাও সম্ভব। তারা বলছেন, প্রেসিডেন্ট সংসদ ভেঙে দিয়ে অবিলম্বে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন। সংবিধানের ১২৩(ক) অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে এ ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং ১২৩(খ) অনুযায়ী মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে সংবিধানে কোনো বাধা নেই। বিলুপ্ত সরকারের সব মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। শেখ হাসিনাকে রেখেই বিলুপ্ত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, তার নেতৃত্বে সব দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে। উপদেষ্টা হওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু সংসদ সদস্য হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তাই যে কেউ বা যতজন ইচ্ছা নির্বাচনকালীন উপদেষ্টা রাখা যাবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক এক বা একাধিক উপদেষ্টা নিয়ে ১০ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা যায়। তবে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কোনো মন্ত্রণালয় থাকবে না। তার কোনো কাজও থাকবে না; বরং উপদেষ্টাদের উপদেশ অনুযায়ীই প্রধানমন্ত্রীসহ নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালিত হবে। সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশেই সব রাজবন্দিকে মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার সম্ভব। সেই সঙ্গে খালেদা জিয়াসহ যাদের দণ্ড হয়েছে, প্রেসিডেন্ট তাদের দণ্ড মওকুফ করে মুক্তি দেবেন। সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশ অনুযায়ী- প্রেসিডেন্ট স্বাধীন, গ্রহণযোগ্য ও সক্রিয় নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন। এরপরই প্রেসিডেন্ট অর্ডিন্যান্স জারি করে সর্বসম্মত সুপারিশে আরপিও সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, ইভিএম বাতিল ও নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা নেবেন। বিদ্যমান সংবিধানের ৪৮(৩), ৫৬(২), ৫৭(১)(খ), ৫৭(২), ৫৮(৪), ৭২ এর ৩, ১২৩(৩)(খ) অনুচ্ছেদের নির্দেশনার মাধ্যমেই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ বের করা সম্ভব বলে মনে করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে পরবর্তী দু’টি সংসদ নির্বাচন (দশম ও একাদশ) নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা এবং নির্বাচনের ৪২ দিন আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি ছোট মন্ত্রিসভা গঠনসহ বিভিন্ন নির্দেশনার কথা আছে। ফ্রন্টের নেতারা বলছেন, সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা সংবিধানসম্মত ও ওয়েস্টমিনস্টার মডেলের সংসদীয় রীতি মেনে চলা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অনুশীলনের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশে ২০১৪ সালের নির্বাচন ছাড়া ৯টি নির্বাচনই হয়েছে সংসদ ভেঙে দিয়ে। ১৯৭৩ সালে গণপরিষদ ভেঙে দিয়েই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘আলোচনার ভিত্তিতে ঐকমত্য হলে সংবিধানের মধ্যে থেকেই সংকট সমাধান সম্ভব।’ নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘আমরা সংলাপে দেখিয়ে দেবো, কিভাবে সংবিধানের ভেতর থেকেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।’

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সংলাপের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং...
১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সংসদে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগের দুই উপ-নেতার মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। ১৩ অক্টোবর দুই নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিব। তার মধ্যস্থতায় সংলাপে দুই নেত্রী আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিলেও চেষ্টা সফল হয়নি। ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকারের ইস্যুতে প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী ৬ দফা সংলাপ হলেও সমঝোতা হয়নি। ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার ঢাকায় আসেন। তার মধ্যস্থতায় দুই বার ও জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের উপস্থিতি একবার বৈঠক করেও সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেননি আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাসে সংলাপ আনুষ্ঠানিকভাবে সফল না হলেও বিভিন্ন সময় জাতীয় স্বার্থে সমঝোতা বা একটা আপসমূলক অবস্থায় পৌঁছানোর নজির আছে। যেমনটি হয়েছিল, সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংযুক্তির সময়।

আলোর রেখা না আলেয়ার বিভ্রম
একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ইতিহাসের প্রথম জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে গণভবনে। ছাড় দেয়ার ইঙ্গিত মিলিছে দুইপক্ষেই। এখন সরকার ছাড় দেবে, এটা একটা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা। বাস্তবে নির্দলীয় সরকার গঠনসহ ঐক্যফ্রন্টের প্রধান তিনটি দাবির ব্যাপারে ছাড় দেয়ার সরকারের তরফে সামান্য আভাসও নেই। সুতরাং হতাশা কাটেনি। প্রথম দফা সংলাপে যাওয়ার আগে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন- ‘লোভ দেখানো ও আমাদের ফাঁদে ফেলার সংলাপ। আওয়ামী লীগ চিনি। ফাঁদে ফেলবেন, ধোঁকা দেবেন।’ তার এ আশঙ্কা এবং সংলাপের ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্য হয় তাহলে কী হবে? আপাতত সরলীকরণকৃত উত্তর- হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতি ফিরে যাবে সংঘাতের দিনে। ফলে স্পষ্ট নয়, চলমান সংলাপ আলোর রেখা না আলেয়ার বিভ্রম।

Disconnect