ফনেটিক ইউনিজয়
স্মার্ট কার্ডের আনস্মার্ট অবস্থা
হামিদ সরকার

স্মার্ট কার্ড এখন অনেকটাই আনস্মার্টে পরিণত হয়েছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ কার্ডের ভুল এবং বিকৃত বানানের কারণে অনেক ক্ষেত্রে এটিকে প্রদর্শন করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঠিক তথ্যকেও বিকৃত করে এই কার্ডকে ‘আনস্মার্ট’ করা হয়েছে। এনআইডি’র সাথে স্মার্ট কার্ডের নামের অমিল দেখা যাচ্ছে। কারণ আগের এনআইডি’র ফরমগুলোর হদিস মিলছে না। আর ছবির সাথে ব্যক্তির চেহারার মিল খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। আবার ‘আনস্মার্ট’ বিতরণ ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। অন্যদিকে, মেশিন সমস্যার কারণে স্মার্ট কার্ডও প্রিন্ট করতে বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন সেই লেমিনেটেড করা এনআইডি কার্ডই ব্যবহার করতে হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে সরকারের সেই ‘স্মার্ট’ উদ্দেশ্যটি।
নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, এখানে অবাক হবার বিষয় হচ্ছে- আট কোটিরও বেশি নাগরিকের এনআইডি কার্ডের (জাতীয় পরিচয়পত্র) মূল তথ্য ফরমের সন্ধান এখন পাওয়া যাচ্ছে না। এসব নাগরিক ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে নিজেদের ছবিসহ ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন এলাকার নির্বাচনী অফিসে এসব ফরম সংরক্ষিত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে উইপোকা ও ইঁদুর ফরম নষ্ট করে ফেলেছে। কোথাও পানিতে নষ্ট বা নাশকতার আগুনে পুড়ে গেছে। এখন ভুলটা কাদের, নির্বাচন কমিশনের না নাগরিকদের, তা যাচাই করার উপায় নেই। সঠিকভাবে সংরক্ষণের অভাবেই আজ এ পরিণতি।
ভুলে ভরা ওইসব এনআইডি সংশোধন করতে গিয়ে নাগরিকরা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভুক্তভোগী নাগরিকদের জানান, ১০ বছর আগে ভোটার করার সময় তাদের পূরণ করা ২ নম্বর ফরম (এনআইডি’র জন্য বিশেষ ফরম) পাওয়া যাচ্ছে না। এই আট কোটি নাগরিক ছবিসহ ভোটার তালিকা করার উদ্যোগের প্রথম ধাপে তথ্য দিয়েছিল। ফরম নষ্ট হওয়ার দায়টি যদিও নাগরিকদের নয়, তবে তথ্য সংশোধন করতে হলে তাদের ২৫০ টাকার মতো ফি দিতে হবে। তবে ২০০৮ সালের পরে যারা ভোটার হয়েছেন তাদের এনআইডি’র ভুল সংশোধন প্রথমবারের মতো ফি ছাড়া করার সুযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংক এই স্মার্ট কার্ড প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ালে সকল ভোটারদের স্মার্ট কার্ড দিতে হলে বাকি কাজ সরকারকে নিজের তহবিল থেকেই যোগান দিতে হচ্ছে। আর এর জন্য পাঁচ বছরে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর ইনহ্যান্স একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের আওতায় ২০১১ সালের জুলাই মাসে ৯ কোটি ভোটারকে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১১ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৭ কোটি মার্কিন ডলার। পাঁচ বছরব্যাপী প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালের জুনে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র স্মার্ট কার্ড প্রদান ও বিতরণ প্রকল্পের মেয়াদ ১৮ মাস বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু এতেও কাজ শেষ হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য একাধিকবার বিশ্বব্যাংককে অনুরোধ করা হয়েছে। গত ২০১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে, আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হবে না।
২০১৬ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। পরদিন ৩ অক্টোবর থেকে রাজধানী ঢাকা ও বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের মাঝে কার্ড বিতরণ শুরু হয়। ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকার বিতরণ কার্যক্রম চলে। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য ৫টি বিভাগীয় শহরে বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এই স্মার্ট কার্ড পেতেও যেমন ভোগান্তি, আবার প্রাপ্ত স্মার্ট কার্ড নিয়েও ভোগান্তিতে রয়েছে সাধারণ মানুষ। আর এ ভোগান্তি সারা দেশেই।
এদিকে, গত আগস্টে ২৭ জেলাতে স্মার্ট কার্ড বিতরণ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বলেন, আগামী ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসের মধ্যে দেশের নাগরিকদের হাতে উন্নত মানের জাতীয় পরিচয়পত্র (স্মার্ট কার্ড) পৌঁছে দেয়া হবে। উল্লেখ্য, উন্নত মানের ভুলে ভরা এই কার্ড নিয়ে জনগণ এখন বিব্রত।
ইসি’র সংশ্লিষ্ট উইংয়ের কারিগরি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা হলো- দেশে এখন ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখের মতো। এর মধ্যে দুই কোটির কিছু বেশি ভোটারের ওই বিশেষ তথ্য ফরম থাকলেও বাকিদের ফরম সার্ভারে নেই। ২০০৮ সালের ওই সব ফরম সংগ্রহ করে পিডিএফ আকারে সার্ভারে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সব ফরম না পাওয়ার কারণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নতমানের স্মার্ট এনআইডি কার্ড প্রস্তুতের আগে ভুল তথ্য সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথাও ইসি থেকে বলে আসা হচ্ছিল। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি অনলাইনে সংশোধন সেবা চালু করা হয়। তাতেও তেমন কারো সাড়া মেলেনি। একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে সংশোধনে ফি নেয়া শুরু হয়।
৯ কোটি ভোটারকে স্মার্ট কার্ড দিতে বিলম্ব হবার কারণেই বিকল্প পথ। আর এনআইডি’র পরিচালক (অপারেশন) মো. আবদুল বাতেন সম্প্রতি জানান, যেসব নাগরিককে এখনো স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া যায়নি, তাদের আপাতত লেমিনেটেড কার্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত জুলাইয়ে স্মার্ট টেকনোলজির সাথে নতুন করে চুক্তি হয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক জেলায় কার্ড মুদ্রণ শেষে তা মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, দেশের সকল নাগরিকদের জন্য এই এনআইডি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা একটি বিশাল কাজ। এতে কিছুটা ভুল হতেই পারে। তবে নির্বাচন কমিশন থেকে ঘোষণা দিয়ে অনেকবার বিনা খরচে এই ভুল সংশোধনের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সুযোগ থাকার পরও কেউ কেউ সংশোধন করে নেয়নি।

Disconnect