ফনেটিক ইউনিজয়
বিদেশে নারী শ্রমিক নির্যাতনের নির্মম গাথা
সেলিম আহমেদ

ওদের কেউ স্বামী পরিত্যক্তা, কেউ স্বামীর কাছে নির্যাতিত, কারো বসা হয়নি বিয়ের পিঁড়িতে। তাদের অভাবের সংসার। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতে বেঁচে থাকাটাই ছিল কষ্টের। তাই তো সুখের আশায় মা-বাবা, সন্তান আর স্বজনদের ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন দূর প্রবাসে। স্বপ্ন দেখেছিলেন মরুর দেশ সৌদি আরবে গিয়ে রোজগার করে আলো ফেরাবেন সংসারের। কিন্তু তা আর হলো না। সেখানে মুখোমুখি হন আরেক ভয়ঙ্কর জীবনের। শিকার হন যৌন নির্যাতনের, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের। স্ত্রী, ছেলে, মালিক কেউই বাদ যেত না- মালিকের বাসার প্রত্যেক লোকের কাছে নির্যাতিত ছিলেন তারা। অবশেষে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে দেশে ফিরেছেন তারা। লোকলজ্জায় বের হতে পারেন না বাড়ি থেকে। কেউ কেউ হারিয়েছেন মানসিক ভারসাম্যও।
দরিদ্র বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে সৌদি আরবে যান হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার এক তরুণী (২০)। ‘গৃহকর্মী’র কাজের কথা বলে সৌদি আরবে নিয়ে নিয়োগ করা হয় দেহব্যবসায়। পরে হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর হস্তক্ষেপে চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন তিনি।  
ওই তরুণী জানান, ঢাকার গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গত ৬ ডিসেম্বর গৃহপরিচারিকার চাকরি নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যান তিনি। কিন্তু তাঁকে গৃহপরিচারিকার কোনো কাজ দেয়া হয়নি। হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারীর সঙ্গে তাঁকেও বন্দি করে রাখা হয় এক ঘরে। সেখানকার দালাল তাঁদের তিন-চারদিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়। শুরু হয় তাঁদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। সেখানে তাদের অর্থও দালালরা নিয়ে যায়। কেউ কোনো প্রতিবাদ জানালে মারধর করা হতো। পরে ওই তরুণী বিষয়টি মুঠোফোনে তার বাবা-মা’কে জানালে তারা হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর দ্বারস্থ হন। পরে আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সি থেকে দালাল চক্রের তিন সদস্যকে আটক করে। পরবর্তীতে তাদের আদালতের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয় জেল হাজতে।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌর শহরের দতরমুড়ি গ্রামের এক গৃহবধূ (৩৫)। অভাবের সংসার তার। পরিবারের অভাব ঘুচাতে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ২০ হাজার টাকা বেতনে গৃহকর্মীর কাজের প্রলোভন দেখানো হয় তাকে। কিন্তু তাকে সেখানকার এক বাসায় আটকে রেখে চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন। চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি বিদেশ থেকে ফিরে এসে থানায় লিখিত অভিযোগ ও সাংবাদিকদের কাছে সৌদি আরবে থাকাকালীন লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দেন ওই গৃহবধূ।
তিনি জানান, উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের কামারকান্দি গ্রামের মৃত আবদুল আলী ওরফে বন্দই মিয়ার ছেলে শাহজাহান মিয়া (৪০) তাকে ভিসা দিয়ে সৌদি আরবে নেন। এর আগে শাহজাহান মিয়ার ভাই ও ভবানীপুর গ্রামের তাদের বোনের জামাই কনু মিয়া ওরফে চৌধুরী সৌদি আরবে ২০ হাজার টাকা বেতনে নারী কর্মী হিসেবে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবে রাজি হলে বানানো হয় পাসপোর্ট (নং বিএল ০৩০৬০৮১)। ভিসার মূল্য বাবত সৌদি আরব যাওয়ার আগে দেয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর সৌদি আরবে পাঠানো হয় ওই গৃহবধূকে।
সৌদি আরব এয়ারপোর্ট থেকে তাকে নিজের বাসায় নিয়ে যায় শাহজাহান। সেই বাসায় আটকে রেখে ওই গৃহবধূকে নিজে ধর্ষণ করে। নির্ধারিত কর্মস্থলে না নিয়ে শাহজাহান প্রতিদিন ধর্ষণ করতে থাকে। শুধু সে নিজে নয়, প্রতিদিন ৫-৬ জন লোক নিয়ে আসতো বাসায়। যারা ওই গৃহবধূকে যৌন নির্যাতন চালাতো। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু তাতেও রেহাই মেলেনি। একপ্রকার নেশা জাতীয় দ্রব্য জোরপূর্বক খাওয়ানো হতো তাকে। সেই নেশাদ্রব্য খাওয়ার পর অবচেতন হয়ে পড়তেন তিনি। শুধু চোখ দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন। কিছু বুঝতেন না। এই অবচেতন অবস্থায় ৫-৬ জন লোক তাকে নির্যাতন করতো। অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকলে ১১ ফেব্রুয়ারি গৃহবধূকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ফেরত পাঠানোর সময় সৌদি আরবের বিমানবন্দর থেকে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে এক কাপড়ে বিমানে তুলে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাকে।
নুরুন্নাহার বেগমের গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর ইটাখোলায়। ১০ বছর আগে একই গ্রামের ভ্যানচালক সাগরের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তাদের সংসারে ৭ বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। স্বামী মাদকাসক্ত হওয়ায় বিয়ের কয়েক বছর পর ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যান তিনি। অভাবের সংসারে ভাগ্য পরিবর্তনের আসায় চলতি বছরের ১০ এপ্রিল স্থানীয় দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হয়নি। প্রায় ২ মাস মক্তবে আটকে রেখে তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। অবশেষে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন দেশে। তিনি বলেন, দেশে ফিরেও ভালো নেই। সমাজ ভালো চোখে দেখছে না। বাইরে বের হতে পারি না। মানুষ নানা বাজে কথা বলে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক-এর তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন দেড় হাজার নারীকর্মী। একই সংস্থার জরিপ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত গত ২৮ বছরে বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিক গেছে ৭ লাখ ৬৩ হাজার ৫২ জন। এরমধ্যে আড়াই লাখই গেছেন সৌদি আরবে। এ ছাড়া জর্ডানে ১ লাখ ৩৩ হাজার, আরব আমিরাতে ১ লাখ ২৭ হাজার, লেবাননে ১ লাখ ৪ হাজার, ওমানে ৬৯ হাজার, কাতারে ২৭ হাজার এবং মরিশাসে ১৬ হাজার নারী গেছেন। জর্ডান ও লেবাননে পোশাক কারখানায় কাজ করতে যাওয়া অধিকাংশ নারী শ্রমিক ভালো অবস্থায় আছেন বলে জানা গেছে। অন্য দেশগুলোয় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া অনেকেই ভালো নেই। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সৌদি আরবে থাকা গৃহকর্মীদের।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) দেয়া তথ্যমতে, ১৯৯১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত অভিবাসন প্রত্যাশী নারী শ্রমিককে অভিবাসনে যেতে বাধা দেয়া হলেও ২০০৩ এবং ২০০৬ সালে তা কিছুটা শিথিল করা হয়। ২০০৪ সালের পর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারী শ্রমিকের অভিবাসন হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মোট অভিবাসনের ১৯ শতাংশে। তবে ২০১৬ সালে অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা নেমে আসে ১৬ শতাংশে এবং ২০১৭ সালে ১৩ শতাংশে। ২০১৭ সালে অভিবাসী নারীর সংখ্যা ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন, যা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক জানান, ‘বর্তমানে আমাদের দেশের প্রায় ৮০ লাখ লোক বিদেশে আছেন। যার মধ্যে কয়েক লাখ হচ্ছেন নারী শ্রমিক। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী নির্যাতন বন্ধে সরকারের উদ্দেশ্যে বলতে চাই নারী গৃহকর্মীদের বিদেশ পাঠানোর আগে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ওপর যে নির্যাতন করা হচ্ছে, তা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। অতএব সরকারকে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।’

Disconnect