ফনেটিক ইউনিজয়
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় পিডিবি
মারুফ আহমেদ

তেল উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের তেলের উৎপাদন কমছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা রাশিয়া এবং সৌদি আরব উৎপাদন কমাতে চাইছে। আর পঞ্চম অবস্থানে থাকা ইরানের ওপর ফের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এমন পরিস্থিতিতে চীন-ভারতসহ দ্রুত বর্ধনশীল ও বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েই চলেছে। ফলে চাহিদার চেয়ে জোগান বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম। গত তিন সপ্তাহ ধরে প্রতি ব্যারেল তেলের (ক্রুড অয়েল) দাম ৭৫ থেকে ৮৬ মার্কিন ডলারে উঠানামা করছে। আগামী বছরের শেষ নাগাদ তা ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে জ্বালানি-অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এমন অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতের নেতৃস্থানীয় সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অন্য উৎপাদকদের কাছ থেকে পাইকারি দরে কেনা- উভয়ক্ষেত্রেই লোকসান দেখছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
পিডিবি’র একাধিক কর্মকর্তা জানান, দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৩৩ শতাংশ (ক্যাপটিভ বাদে) আসে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে। ডিজেলচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি তেলের দামও পরিশোধ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিই। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে আর্থিকভাবে এমনিতেই লোকসান গুনছে পিডিবি। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পিডিবি’র লোকসানের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আর্থিক সংকটের কারণে বেসরকারি কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নির্ধারিত সময়ে পাইকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অব্যাহত দাম বৃদ্ধি পিডিবি’র আর্থিক চাপ আরো বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি সরকারকে হয়তো ভর্তুকির পরিমাণ এখনকার দ্বিগুণ করতে হবে। তা না হলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে। আর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অন্যান্য খাতে। এছাড়া নির্বাচনী মৌসুমে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা নেই।
এ প্রসঙ্গে পিডিবি’র চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে পড়ছে। তেলের দাম যত বাড়বে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচও সে হারে বাড়বে। তাই বিদ্যুতের খুচরা মূল্য বাড়ানো না গেলে খরচ মেটানো কঠিন হয়ে যাবে। আর্থিক চাপ বাড়বে। সেক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি বাড়ানোর বিকল্প আপাতত নেই।  
২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছুঁয়েছিল। পরবর্তীতে তা কমতে থাকে এবং ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে আসে। গত বছরের নভেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অন্যতম জোগানদাতা ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রে শেল অয়েলের উৎপাদন কমে যাওয়া এ দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। উৎপাদন কমিয়ে পণ্যটির দাম বাড়াতে চাইছে জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকও। তাদের সেই ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটছে। গত অক্টোবরেই প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের কাছাকাছি চলে যায়।
ব্লুমবার্গ ও দ্য ইকোনমি ফোরকাস্ট এজেন্সির প্রতিবেদন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের এ দরবৃদ্ধি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। ২০১৯ সাল শেষ নাগাদ তা ১১৮ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) মনে করছে, ২০১৯ সালে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম বর্তমানের চেয়ে গড়ে দেড় থেকে ২ ডলার বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে শেল অয়েল ও ওপেকভুক্ত দেশগুলোয় উৎপাদন বাড়লেই কেবল জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এ পর্যায়ে থাকবে বলে জানিয়েছে তারা।
পিডিবি জানায়, দেশে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ক্যাপটিভ পাওয়ারে উৎপাদিত হচ্ছে ৩ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক সাড়ে ১০ হাজার থেকে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর উৎস জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রাকৃতিক গ্যাস, ফার্নেস ও ডিজেল, কয়লা এবং কাপ্তাই হ্রদের পানি। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন হচ্ছে ৩৩ শতাংশ বিদ্যুৎ। এ জ্বালানি থেকে উৎপাদনব্যয় গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে অনেক বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গ্যাসভিত্তিক প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় (অনিরীক্ষিত) হয়েছে ২ টাকা ৮০ পয়সা। প্রতি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস তেলে খরচ ১১ টাকা ৪৮ পয়সা, ডিজেলে ১৯ টাকা ৩০ পয়সা, কয়লায় ৭ টাকা ৩৮ পয়সা এবং জলবিদ্যুতে মাত্র ১ টাকা ৩২ পয়সা। এছাড়া প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ১৬ টাকা ১৪ পয়সা।

Disconnect