ফনেটিক ইউনিজয়
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
চাপের মুখে ইসি
হামিদ সরকার

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ চাপের মুখে রয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথমবারের মতো একটি রাজনৈতিক দলীয় সরকারকে ক্ষমতায় এবং মন্ত্রী, এমপি ও সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা ইসি’র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের কাঁধে ন্যস্ত, কিন্তু এখনো তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা রাজনীতির সমতল মাঠ তৈরি করতে পারেনি বলে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের অভিযোগ। সমতল মাঠ তৈরি করাই ইসি’র সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নিজের কোনো লোকবল না থাকায় ইসিকে সরকারের নির্ধারিত প্রশাসনকে দিয়েই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। আর এটাতেই আপত্তি সরকারবিরোধী জোটের। প্রতিদিনই পুলিশ তাদের নেতাকর্মীদের হয়রানি ও গ্রেফতার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তফসিলের পর থেকেই বিরোধী জোটের তোপের মুখে আছে ইসি। ভোর না হতেই বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগের চিঠি গ্রহণ করতে হচ্ছে ইসিকে। শুনতে হচ্ছে তাদের অভিযোগ ও দাবিগুলো। কিন্তু বাস্তবায়নের পথটা ইসি’র কাছে অত্যন্ত সরু। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন সরকারি দলের প্রতিনিধিরাও এসে পাল্টা অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে দু’বিরোধী জোটের তোপে ইসি এখন বেশ চাপের মুখে রয়েছে। আবার বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে তারা কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের আপত্তি সত্ত্বেও ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্তও ইসিকে সমালোচিত করছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের কারণে তৎকালীন ইসি দেশে ও বিদেশে প্রশ্নবিদ্ধ ও সমালোচিত আজও।
সিইসি নূরুল হুদা অবশ্য বলছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বিরাজ করছে। কমিশনের কথা অনুসারেই পুলিশ কাজ করছে। সিইসি’র এই দাবির সাথে মিল নেই নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যের। তিনি মনে করেন, সরকার না চাইলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এককভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। এই অবস্থা যে নেই, তার কয়েকটি উদাহরণও তুলে ধরেছেন তিনি। প্রশাসন ও ইসি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আজো সৃষ্টি করতে পারেনি বলে প্রতিদিনই অভিযোগের পাহাড় জমছে। এসব অভিযোগের সুরাহা করতেও ইসি’র কার্যত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সবার জন্য সমতল মাঠ নিশ্চিত করে ভোটের তারিখ ঘোষণার দাবি করেছিল। কিন্তু বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে ইসি ২৩ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণকে চূড়ান্ত করে তফসিল ঘোষণা করে। বিরোধীজোটের অব্যাহত চাপের মুখে ইসি সেই তারিখকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। পরে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন পুনঃনির্ধারণ করা হয়। এখন বিরোধীজোট সচিব, ডিসি, এসপিসহ বর্তমান প্রশাসনের ৯২ কর্মকর্তাকে বদলি, কাউকে নির্বাচনী কাজ থেকে বিরত রাখার দাবি জানিয়ে ইসি’র কাছে তালিকাও দিয়েছে। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভায় ওই বাহিনীদের পক্ষ থেকে এই বদলির ব্যাপারে সরাসরি আপত্তি তোলা হয়েছে। এমনকি তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে গ্রেফতারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অব্যাহত রাখার ব্যাপারে ইসি’র অনুমতি চায় বলে ওই সভা সূত্রে জানা গেছে। তবে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদও জানিয়েছেন, ঢালাওভাবে কোনো অভিযোগ এলে সেটায় তাদের পক্ষে প্রশাসনে বদলি করা সম্ভব নয়।
ইসি সমতল মাঠ গঠন নিয়েও একটা চাপের মধ্যে রয়েছে এখন। কারণ বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা নির্বাচনের কাজে অংশ নিতে পারছে না পুলিশের হয়রানি ও গ্রেফতারের কারণে। পুলিশ প্রশাসনও ইসি’র কোনো কথা মাঠপর্যায়ে শুনছে না, বা ইসি’র নির্দেশনার মধ্যে একটা ঘাপলা আছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেপরোয়া আচরণ এবং পর্যবেক্ষকদের ‘মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা’র নির্দেশনা দেয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে আন্তর্জাতিক মহল। জাতিসংঘ, প্রভাবশালী দেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেমন ‘সমতল মাঠ’ তৈরি চাপ দিচ্ছে, ঠিক তেমনি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনও চায় নির্বাচনে জনগণের ভোটের প্রতিফলন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের দাবি। ঐক্যফ্রন্ট থেকে শতাধিক ডিসি-এসপি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অপসারণ চেয়ে ইসিতে চিঠি দেয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে ডিসি-এসপি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচিতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের নামে ক্ষমতাসীন আ’লীগের পক্ষে কাজ করার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। কূটনীতিকরা খবরের কাগজ ও চিঠির কপি দেখে অনেকটা হতভম্ব। তারাও এখন এটা নিয়ে ভাবছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে, নির্বাচনের তফসিলকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে সম্প্রতি রিট করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাসদের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবও কয়েকদিন আগে বলেছেন, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বন্ধ করা না হলে আইনের আশ্রয় নিতে তারা বাধ্য হবেন।
সম্প্রতি বিরোধীজোটের নেতা ও সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশে পাইকারীহারে অ্যারেস্ট বন্ধ হওয়া দরকার। পুলিশকে বুঝিয়ে দেয়া উচিত, একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা দরকার। প্রার্থীরা যেন মুক্ত পরিবেশে বক্তব্য রাখতে পারে। তারা যেন তাদের সমর্থকদের কাছে যেতে পারে বিনা বাধায়। তিনি আরও বলেন, পুলিশের কাজ হলো এ ব্যাপারে সহযোগিতা করা। কেননা পুলিশ সকলের, শুধু সরকারের বাহিনী না। এটা তাদের প্রমাণ করতে হবে। আমরা, যারা বিরোধী দলে আছি আমরা যেন সুশাসনের আওয়তায় আসতে পারি। সুশাসন ভোগ করতে পারি। ড. কামাল সিইসি’র উদ্দেশ্যে বলেন, আপনার ব্যাপারে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আগে যা করেছেন, তা ভুলে যেতে চাই। এখন নিরপেক্ষ হোন। আপনি (সিইসি) এখন যা করছেন, তা কি আদিষ্ট হয়ে করছেন? কেন আপনি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া লোকদের ধরাচ্ছেন, সে ব্যাপারে তথ্য সহকারে বলেন।
সাবেক একজন কমিশনার মন্তব্য করেছেন, ইসি’র কাছে যেসব অভিযোগ আসছে সেগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। এসবের প্রতিকারে কার্যকর পদক্ষেপে যেতে হবে। সেটা যদি তারা করতে না পারেন তাহলে ভালো নির্বাচন উপহার দেয়াটা কঠিন হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম. হাফিজউদ্দিন খানের মতে, পরিবেশ পরিস্থিতি যা দেখছি, তাতে সমতল মাঠ সৃষ্টি তো দূরের কথা, নির্বাচন নিয়েই একটা সংশয় কাজ করছে। আমরা যেভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চাচ্ছি, সেটাই এখন প্রশ্নের মুখে। তিনি আরও বলেন, যেখানে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি রয়েছে, সেখানে ইসি ইভিএম ব্যবহারে একগুঁয়েমি করছে।

Disconnect