ফনেটিক ইউনিজয়
এনবিআর-দুদক দ্বন্দ্বের নেপথ্যে
বাবু কামরুজ্জামান

রাষ্ট্রের দুই জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রায়ই যৌথভাবে কাজ করে অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও কর ফাঁকি খুঁজে বের করতে। দুর্নীতি-অনিয়ম রোধে এই দুই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে সম্প্রতি উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান দুই কর্মকর্তা অনেকটা মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন। দুর্নীতি নিয়ে একে-অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক বিরোধ
গত ৮ নভেম্বর আয়কর বিভাগের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধের সুপারিশমালা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে জমা দেয় দুদক। যেখানে কর বিভাগে ১৩ ধরনের দুর্নীতি হয় জানিয়ে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৩টি সুপারিশ করে সংস্থাটি। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে টানাপড়েন। দুদকের এমন সুপারিশের বিষয়ে ১১ নভেম্বর এনবিআর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি দুদকের সঙ্গে একমত নই।’ দুদকেরও এমন দুর্নীতির অনেক ক্ষেত্র আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সকলেরই দুর্নীতি আছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কম হলেও এমন দুর্নীতি হয়। তবে নতুন বেতন কাঠামো গঠন করার পর দুর্নীতি অনেক কমেছে।
এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, দুদক যদি শুধুমাত্র কর ও কাস্টমস অফিসকে টার্গেট করে কাজ করে ও এখানে অফিস স্থাপন করার চিন্তা করে, তাহলে আমি বলবো এটা দুদকের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব হবে না। কারণ আয়কর ও কাস্টমস আইনে না চাইলে এখানে কারো পক্ষে অফিস স্থাপন করা সম্ভব নয়।
এনবিআর চেয়ারম্যানের এমন বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের বিপরীতে ১৯ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই জেনে ও বুঝে মন্তব্য করা উচিত। কোনও প্রতিষ্ঠানই নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না, তাদের দোষত্রুটি নেই। যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধেই শুধু ব্যবস্থা নেয় দুদক। এখানে রাগ-অনুরাগের কোনো বিষয় নেই। দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও চাকরি গেছে।’ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এনবিআর’র দুর্নীতি দূর করা বা অনুসন্ধান করা দুদকের কাজ নয়। সরকারের কাছে এনবিআর’র দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছি। এটা আমলে নেয়া হবে কি-না তা সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।’
তবে দুদক ও এনবিআর’র এমন বাদানুবাদ ছাড়াও আছে একাধিক যৌথ উদ্যোগ। এই যেমন ২০১৭ সালেও উভয় প্রতিষ্ঠান একসাথে মাঠে নামে, বিয়ে ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের খরচ এবং উৎসবসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখতে। সে সময় ৯ সদস্যের একটি দলও গঠন করা হয়। এছাড়াও বিদেশে অর্থপাচারের একাধিক মামলা তদন্ত করে এই দুই সংস্থা। যদিও দুদকের সঙ্গে এনবিআর’র দ্বন্দ¦ ও মতবিরোধের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ২০১৫ সালে এমন দ্বিমুখী অবস্থান তৈরি হয়েছিল দুই সংস্থার। মানিলন্ডারিং মামলার তদন্ত নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গোলযোগ তৈরি হয়। ক্ষমতার ভাগ ছাড়তে চায় না দুই সংস্থার কেউই।
একাধিক সূত্র জানায়, দুদক ও এনবিআর’র দ্বন্দ্ব সম্প্রতি আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। যার প্রতিফলন ঘটেছে এনবিআর’র কাস্টম বিভাগ নিয়ে দুদকের দেয়া সাম্প্রতিক সুপারিশে। যেখানে কাস্টমসে দুর্নীতির ১৯টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক। কাস্টমস, এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট বিভাগের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২৬ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। ১৮ নভেম্বর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। সুপারিশের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে ওই প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য কমিশনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দুদকের সুপারিশমালায় বলা হয়েছে বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তথা সরকার গভীর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করবে। দুদকের দূরদর্শিতা ও শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করা না হলে এখানে অনিয়ম-দুর্নীতি আরও বেড়ে যাবে বলে জানায় সংস্থাটি। সরকার দেশের অর্থনীতি উন্নয়নে রাজস্ব খাতকে প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে দেখছে। কিন্তু কিছু অসৎ লোকের কারণে সেসব উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই দুদকের শ্রম যেন পণ্ডশ্রমে পরিণত না হয়, সরকারকে এই ব্যাপারে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
বিশেষজ্ঞ মতামত
রাষ্ট্রীয় দুই প্রতিষ্ঠানের এমন মতবিরোধ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এর (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দু’টি প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রীয়ভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ প্রতিষ্ঠান দু’টির সমন্বয় প্রয়োজন, সুস্থ প্রতিযোগিতা প্রয়োজন। পরস্পরের উপর এমন দোষারোপ করা ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, দুদক নিজেও স্বীকার করে তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি আছে। সরকারি খাতে কম বেশি সব প্রতিষ্ঠানেই দুর্নীতি রয়েছে। তাই আক্রমণাত্মক না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এমন চিত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষতিকর বলেও মত দেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন বলেন, এনবিআর-এ দুর্নীতি আছে যুগ যুগ ধরে। পাকিস্তান আমলেও যেমন ছিল এখনো আছে। অপরদিকে দুদকের মধ্যেও দুর্নীতির কথা শোনা যায়। তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধেও তদন্তের জন্য এসেছিল দুদক। যার কোনো ভিত্তি ছিল না। এমন অযাচিত হয়রানির ঘটনা একেবারে কম নেই। তাই এভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি না করে দুই সংস্থা একসাথে আলোচনায় বসে সমন্বয় করার পরামর্শ দেন তিনি। বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি আছে এটাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই দেশে সবখানে সুশাসনের খুব অভাব। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার বলেন, অর্থনৈতিকভাবে এখানে সুনির্দিষ্ট বিচার বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। তবে নিজেদের মাঝে ঝগড়া করে নয়, বরং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থে। বলেন, দেশের রাজস্ব চিত্র দেখলে যেমন বোঝা যায় এনবিআর’র আরো অনেক কিছু করার বাকি। তেমনি দুদকের অনেক কর্মকা-ও নানাভাবে সমালোচিত। এক্ষেত্রে সুশাসনের জন্য অনেক কিছু করতে হবে উভয় সংস্থাকেই।

Disconnect