ফনেটিক ইউনিজয়
ফিলিপাইনের পথে মালয়েশিয়া
আহমেদ শরীফ

মার্কিনবিরোধী বক্তব্যের জন্য ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে বিশ্ব মিডিয়ায় বেশ সাড়া ফেলেছেন। তবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নজিব রাজাক সমপরিমাণ আলোচিত হননি। দুতার্তের মার্কিনবিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে বেইজিং ঘুরে আসাটা ছিল ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কিন্তু দুতার্তের বেইজিং সফরের পরপরই নভেম্বরের শুরুতে নজিব রাজাকের  বেইজিং সফর অনেকটাই কম আলোচিত ছিল। অথচ দুতার্তে এবং রাজাকের সফর একত্রে বিশ্লেষণ করে অনেকেই অঙ্ক কষতে শুরু করেছেন। রাজাকের বেইজিং সফরের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রতিরক্ষাবিষয়ক একটি চুক্তি। এই চুক্তির অধীনে মালয়েশিয়া চীন থেকে একাধিক যুদ্ধজাহাজ কিনবে এবং একই ডিজাইনের কিছু জাহাজ মালয়েশিয়ায় তৈরি করবে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এই চুক্তিকে দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা, তথা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীতে চীনের তৈরি কোনো অস্ত্র নেই বললেই চলে; বেশির ভাগই পশ্চিমা অথবা রাশিয়ার ডিজাইনের। মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সেই  দেশের সরকারি সংস্থা ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বারহাদকে (ওয়ানএমডিবি) জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট দুর্নীতির তদন্ত শুরু করলে দুই সম্পর্কের ক্ষেত্রে টানাপোড়েন শুরু হয়।
তবে দ্য ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিনের এক লেখায় প্রশান্ত পরমেশ্বরণ বলেন, মালয়েশিয়ার চীনের দিকে যাওয়াটা হঠাৎ ঘটেনি। ২০১৩ সালের অক্টোবরে দুই দেশের মাঝে সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা’ (কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ)-এর মর্যাদা দেওয়া হয়। এরপর ২০১৪-এর শেষের দিকে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চীনের প্রথম সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে আরও দুবার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। অর্থাৎ মালয়েশিয়া-চীন কৌশলগত ও সামরিক সহযোগিতা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। এবারের যুদ্ধজাহাজ তৈরির চুক্তি সেই ধারাবাহিকতায় হয়েছে। ৬৮ মিটার লম্বা যুদ্ধজাহাজগুলো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ডিজাইন করা ‘দুর্জয়-ক্লাস’ জাহাজের আদলে তৈরি করা হবে। পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জন্য তৈরি করা ‘আজমত-ক্লাস’ এবং পাকিস্তান কোস্ট গার্ডের জন্য তৈরি ‘হিঙ্গোল-ক্লাস’-এর যুদ্ধজাহাজগুলোও মোটামুটি কাছাকাছি ডিজাইনের। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আঞ্চলিক নৌবাহিনীগুলোর এ রকম চিন্তা এই পুরো অঞ্চলে সামরিক সহযোগিতা এবং তথ্য আদান-প্রদানকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যার কৌশলগত গুরুত্ব হবে অপরিসীম।
রাজাক তাঁর চীন সফরকে মালয়েশিয়া সরকারের নীতি পরিবর্তনের আভাস হিসেবেই প্রকাশ করেছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা চায়না ডেইলিতে এক লেখায় রাজাক বলেন, বড় দেশগুলোর উচিত ছোট দেশগুলোর সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করা, যার মাঝে রয়েছে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিরাÑতাদের উচিত নয় আজকের দিনে সেই দেশগুলোকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে উপদেশ দেওয়া, যেগুলোকে তারা একসময় শোষণ করেছে। রাজাক খুব পরিষ্কারভাবেই যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ইউরোপীয় বন্ধুদের উদ্দেশ করেই কথাগুলো বলেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে দুবার মালয়েশিয়া সফর করেছেন। ২০১৪-এর ডিসেম্বরেই ওবামা এবং রাজাককে দেখা গেছে একত্রে গলফ খেলতে। কিন্তু সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে এখনকার ঘটনার মিল খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে। রয়টার্স বলছে, মালয়েশিয়া-চীনের সম্পর্ক প্রকৃত মোড় নেয় যখন ওয়ানএমডিবি কেলেঙ্কারির পর ২০১৫-এর ডিসেম্বরে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চায়না নিউক্লিয়ার পাওয়ার গ্রুপ মালয়েশিয়ার সরকারি এই সংস্থাটিকে বাঁচাতে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। আর এই সম্পর্ক গ্রানাইট ফাউন্ডেশন পেয়ে যায় যখন ২০১৬-এর জুলাইয়ে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস নজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের দুর্নীতির মামলা করে।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মালয়েশিয়ার সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে চীনা বার্তা সংস্থা সিনহুয়া বলে, ২০১৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ১১ শতাংশ বেড়ে হয় প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে চীন সাত বছর ধরে মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। মালয়েশিয়া থেকে চীনে রপ্তানি ১০ শতাংশ বেড়ে ২৪ বিলিয়ন ডলার পেরিয়েছে, যেখানে মালয়েশিয়া পুরো রপ্তানি সেক্টরের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ। আবার চীন হলো মালয়েশিয়ার আমদানি পণ্যের সবচেয়ে বড় উৎস। মালয়েশিয়ার প্রায় ১৯ শতাংশ আমদানি হয় চীন থেকে।
২০১৫ সালে চীন থেকে আমদানি ১২ শতাংশ বেড়ে ৩১ বিলিয়ন ডলার পার হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পড়ে যাওয়ায় মালয়েশিয়ার মূল রপ্তানিপণ্য পেট্রোলিয়াম, পাম তেল, প্রাকৃতিক রাবার এবং এলএনজির রপ্তানি অঙ্ক কমে এসেছে। কিন্তু চীনে মালয়েশিয়ার রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ হলো ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য এবং খনিজ অ্যালুমিনিয়াম,  যেগুলো বেশ ভালো এগোচ্ছে। এভাবে চীনের সঙ্গে মালয়েশিয়ার বাণিজ্যিক নির্ভরতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক স্থবিরতার মাঝে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধি নজিব রাজাক সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ঠেকছে, যা কিনা দুই দেশের সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। ২০১৬-এর নভেম্বরে রাজাকের বেইজিং সফরে দুই দেশের মাঝে সামরিক সহযোগিতাসহ ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। একটি চুক্তি ছিল কুয়ালালামপুর থেকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত একটি হাই স্পিড রেললাইন নির্মাণ, যেটি চীনের ‘ওয়ান-বেল্ট, ওয়ান-রোড’ প্রকল্পেরই অংশ।
নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া নীতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার  দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হবে। চায়না ডেইলিতে লেখায় নজিব রাজাক আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের নৌসীমার সমাধানের কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক আদালতে করা মামলার কথা তিনি উল্লেখ করেননি। দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে বহুপাক্ষিক আলোচনা চাইছে, সেখানে চীন চাইছে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। চীনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মালয়েশিয়াও এখন সমুদ্র-সীমানা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাতেই বেশি আগ্রহী, বিশ্লেষকদের মতে যা দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের হাতকে দুর্বল করবে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা কৌশলগতভাবে মালাক্কা প্রণালিতে চীনের অবস্থানকে সংহত করবে। এভাবে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বাস্তবায়ন ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে, যা ২০১৭ সালে ট্রাম্প সরকারকে মৌলিক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহী করতে পারে।

Disconnect