ফনেটিক ইউনিজয়
শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা সফল হবেন গুতেরেস
মাসুদুর রহমান

নতুন বছরের প্রথম দিনে শান্তির আহ্বানের মধ্য দিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তনিও গুতেরেস। তিনি ২০১৭ সালকে শান্তিবর্ষ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে আমার সঙ্গে নতুন বছরের রেজ্যুলেশন হিসেবে শান্তিকে প্রথম স্থানে বিবেচনা করার অঙ্গীকারে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাই।’ তাঁর আহ্বানের ফলে একটি প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দেয়, কোটি কোটি মানুষ সংঘাতের মধ্যে পড়ে যে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে, সেখান থেকে তাদের বের করে আনার কি উপায় আছে? গুতেরেস সব নাগরিক, সরকার ও নেতাকে মতপার্থক্য ফেলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘শান্তিই হবে আমাদের লক্ষ্য, শান্তিই হবে আমাদের পথপ্রদর্শক।’ এখন প্রশ্ন হলো, গুতেরেস জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কতটা সফল হবেন?
২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর জাতিসংঘের নবম মহাসচিব নিযুক্ত হন আন্তোনিও গুতেরেস। ৬৭ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিক পাঁচ বছরের জন্য এ বিশ্ব সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সেই হিসাবে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর মেয়াদ শেষ হবে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রধান ছিলেন। রাজনীতি ও কূটনীতিতে তাঁর এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সক্ষমতা আছে। তবে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দিনের পর দিন অস্থির হচ্ছে, বিশ্বের দেশে দেশে হানাহানি বাড়ছে, গৃহযুদ্ধ প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতি সামাল দিয়ে শান্তি আনার কাজ সহজ নয়। বিশ্বে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সদিচ্ছা কাজ না করলে জাতিসংঘ মহাসচিব এককভাবে কতটা সফল হবেন, সেই নিয়ে সংশয় রয়েই যায়।
লিসবনে জন্ম নেওয়া আন্তনিও গুতেরেসের শৈশব কেটেছে প্রত্যন্ত গ্রামে। সেখানে মানুষ নিরন্তর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেন। সেই সংগ্রাম দেখে তিনি বড় হয়েছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান শত্রু যে দারিদ্র্য, সেটা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। লিসবনের দিনগুলোতে তিনি বস্তিতে গিয়ে শিশুদের বিনা পয়সায় লেখাপড়া শেখাতেন। এই কাজ তিনি করেছেন স্বেচ্ছায়, লোক দেখানোর জন্য নয়। পর্তুগালে তিনি কর্তৃত্ববাদী শাসন দেখে বেড়ে উঠেছেন। ওই সময়ে কোনো ক্যাথলিক কোনোভাবেই সমাজতান্ত্রিক শাসনে বা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাননি। সেই বিপ্লবের যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে ৪৮ বছরের শাসনের পর। কিন্তু বিপ্লবের ওই সময়টাতেই গুতেরেস চিলির বামপন্থী নেতা সালভেদর আলেন্দের অনুসারী হিসেবে প্রকৌশলের ছাত্র থাকাকালেই নিজেকে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষের লোক হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। প্রকৌশলবিদ্যার প্রভাষক থেকে ১৯৭৬ সালে প্রথম এমপি নির্বাচিত হন। পর্তুগালে বিপ্লবের পর এটাই ছিল প্রথম গণতান্ত্রিক ভোট আর এতে তিনি সোশ্যালিস্ট পার্টির এমপি হন। মানবতাবাদী সেøাগান দিয়ে ১৯৯৫ সালে তিনি পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রথমে পর্তুগালে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়। তিনি নিম্নতম আয় নির্ধারণে সমর্থ হন। সবার জন্য নার্সারি শিক্ষার গ্যারান্টিও দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সরকার ছিল সংখ্যালঘু সরকার। ফলে কোনো কিছু পাস করাতে হলেই বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হতো। এটাকে তাই অনেকে মনে করেন জাতিসংঘ মহাসচিব পদের উপযুক্ত এক প্রশিক্ষণ। অন্যের দৃষ্টিকোণ তিনি সহজেই বুঝতে পারেন, তাই সমাধানের পথ আবিষ্কারে দক্ষ।
গুতেরেসের পারিবারিক ট্র্যাজেডি তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে খুবই ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছিল। তাঁর স্ত্রী লুসিয়ার গর্ভে দুই সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু লুসিয়া খুবই গুরুতর অসুস্থ ছিলেন দীর্ঘদিন। তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন। প্রতি শুক্রবার লন্ডন যেতেন আর সোমবার ফিরতেন। এভাবে কেটেছে অনেক সময়। ১৯৯৮ সালে তাঁর স্ত্রী মারা যান। পরের বছরেই গুতেরেস নিজেকে নির্বাচনে অবতীর্ণ করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে আবার যখন সোশ্যালিস্ট সংখ্যালঘু সরকার গঠন করেন, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনেক নিচে নেমে যায়। গোটা পরিস্থিতি অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। দলের মধ্যেও অনেক জটিলতায় পড়ে গুতেরেস নিজেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আগ্রহী করে তোলেন। ১৯৯৯ সালে গণভোটে ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার পক্ষে রায় পাওয়ার পর পূর্ব তিমুরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি তখন জাতিসংঘকে সেখানে হস্তক্ষেপে রাজি করাতে সক্ষম হন। এতে করে পূর্ব তিমুরে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রেসিডেন্সি যায় পর্তুগালের হাতে। ২০০২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মেয়াদ পুরো না করেই তিনি পদত্যাগ করেন। ওই সময়ে স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে গুতেরেসের দল সোশ্যালিস্ট পার্টি একের পর এক পরাজিত হচ্ছিল। তাই দেশকে কোনো সংকটে ফেলতে চান না বলে রাজনীতির মাঠ থেকে বিদায় নেন তিনি। ওই সময়ে সমালোচিত হলেও দায়িত্বের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচল। তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেকে সমর্পণ করেনÑ২০০৫ সালে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যোগ্যতাই যথেষ্ট নয়। বিশ্ব নেতাদের সদিচ্ছার প্রয়োজন অনেক বেশি।
বিশ্বে আজকের দিনে যেভাবে একের পর এক কট্টরপন্থীদের জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে, তাতে সবাইকে এক টেবিলে আনা খুবই কঠিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর কথা যাকে অনেকেই বলছেন নব্য নাজি নীতি। জাতিসংঘে ট্রাম্প কী করবেন, সেটা দেখার জন্য সবাই উদ্বেগের সঙ্গে অপেক্ষা করছে। ব্রিটেনে থেরেসা মে সরকার মূলত কট্টর অভিবাসনবিরোধী এবং ইইউ থেকে নিজেকে আলাদা করার কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সিরিয়া, ইরাকসহ গোটা বিশ্বে মানুষ যুদ্ধবিগ্রহে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বাড়ছে অভিবাসন আর শরণার্থী সংকট। অন্তমুখী উগ্রপন্থা এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে তার থেকে বেরিয়ে বিশ্বকে শান্তি ও উদারতার পথে আনতে গুতেরেস কতটা সক্ষম হবেন, এখন সেটা দেখারই অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

Disconnect